৮৬/৩
২৪ জুলাই ২০২৪। বুধবার।
ভোর ৪টা ২০মিনিট।
ডিএমপির এসি (পল্লবী) কামাল-এর সরকারি মোবাইল ফোন বেজে উঠল। কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভয়ার্ত কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘স্যার! আমাদের বাসায় একটা খুন হয়েছে।’
‘বাসার লোকেশন বলেন।’
‘স্যার, মিরপুর ৬ নম্বর সি ব্লকের ১৫ নম্বর রোড-এর ৮৬/৩ নম্বর বাসা।’
‘আমি বিশ মিনিটের মধ্যে চলে আসব।’
হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। বৃষ্টির মধ্যেই অনেকে নামায পড়তে মসজিদে যাচ্ছিল। কামাল গুগল ম্যাপে তার অবস্থান দেখল। টার্গেট লোকেশন এর ঠিক কাছাকাছি পৌঁছে ড্রাইভারকে বলল, ‘এখানেই দাঁড়াও।’
মিরপুর ৬ নম্বর সি ব্লকের ১৫ নম্বর রোড-এর ৮৬/৩ নম্বর বাসার ঠিক সামনে তার নীলরঙা ডাবল-কেবিন পিকআপ থেকে নেমে পড়ল। গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথে একটা গরম হাওয়া লাগল তার শরীরে। ভ্যাপসা গরম। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ খুব বেশি। কেমন যেন গুমোট একটা পরিবেশ।
কামাল রাস্তা থেকেই বাসাটার দিকে চোখ বুলিয়ে নিল। ছ্য়তলা বাসা। বেশ আধুনিক ঢঙ্গে নির্মাণ করা হয়েছে। বারান্দার গ্রিলগুলোতে অসংখ্য টব ঝুলে রাখা। প্লাস্টিকের টবের রং রোদে ঝলসে গেছে। দেখেই মনে হচ্ছে বেশ পুরনো। তার মানে নতুন ভাড়াটিয়া থাকার সম্ভাবনা নেই।
গ্যারেজের দিকে এগোতেই বাসার দারোয়ান ছোটো পকেট দরজা খুলে দিল। দারোয়ানের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে কামাল এগিয়ে গেল। সামনেই একজন ভদ্রলোক অপেক্ষা করছিল তার জন্য। এগিয়ে এসে বলল, ‘স্যার, আমিই কল করেছিলাম থানায়।’
‘কয় তলায় খুন হয়েছে?’
‘দোতলায়।’
‘আপনি?’
‘আমি মোজাম্মেল। আমার বাবাকে খুন করা হয়েছে।’
কামালকে সিঁড়ির দিকে যেতে দেখে মোজাম্মেল বলে উঠল, ‘স্যার, লিফট চালু আছে। অযথা কষ্ট করবেন কেন?’
কামাল মোজাম্মেলের দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, ‘আমি সিঁড়ি দিয়ে যাব। আপনার কষ্ট হলে আপনি লিফট দিয়ে যান।’
গ্যারেজ থেকে সিঁড়ির দিকে যেতেই কামাল দেখল নিচের দিকেও একটা সিঁড়ি চলে গেছে। বলে, ‘এটা কীসের জন্য?’
‘স্যার, নিচের পার্কিং-এ যাওয়ার সিঁড়ি। আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং পর্যন্ত লিফট নেই। তাই সিঁড়ির ব্যবস্থা।’
‘বুঝেছি।’
কামাল সিঁড়ি থেকেই কান্নার শব্দ পেল। বাসার ভেতরে ঢুকতেই শব্দটা আরও তীব্র হয়ে উঠল।
মোজাম্মেল বাসার মাস্টারবেডের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। ‘স্যার, দরজা ভেতর থেকে লক করা আছে।’
কামাল চমকে উঠে মোজাম্মেলের দিকে তাকাল। ‘ভেতর থেকে দরজা বন্ধ?’
‘জি, স্যার।’
‘তাহলে আপনি কীভাবে জানলেন আপনার বাবা খুন হয়েছে?’
‘স্যার, জুলাই এর ১৭ তারিখে একটা চিঠি এসেছিল। চিঠিতে বাবাকে খুন করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সাতদিনের মধ্যে ওনাকে খুন করা হবে। সে হিসেবে আজই ছিল শেষ দিন। আর, ভোর চারটার দিকে আমরা বাবার চিৎকার শুনতে পাই। অনেক জোরে চিৎকার দিয়ে উঠেছিলেন।’
কামাল নিজের বাসা থেকে বের হওয়ার সময় পল্লবীর ওসি ও এস আই শরীফকে লোকেশন টেক্সট করে দ্রুত আসতে বলেছিল।
ওরা দুজন এসে বাসার ভেতরে ঢুকতেই কামাল বলল, ‘রুম, ভেতর থেকে লক করা আছে। লকটা ভাঙতে হবে। শরীফ দরজার কয়েকটা ছবি নিয়ে রাখো।’
শরীফের ছবি তোলা শেষ হলে দরজার লক ভাঙা হলো। রুমে ঢুকতেই নাকে একটা দুর্গন্ধ লাগল। কামাল পকেট থেকে একটা মাস্ক বের করে পরে নিল। বিছানায় ডেড বডি পড়ে আছে। তেমন খুব একটা স্ট্রাগলের চিহ্ন নেই। বিছানাটাও বেশ পরিপাটি করে গুছানো। কোথাও কোনো রক্তের চিহ্ন নেই। জানালার পাশের গ্লাসডোর-এর কাচ ভাঙা।
‘শরীফ, ডেডবডির ছবি নাও। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে পুরো রুমের ছবি নাও।’ শরীফের ক্যামেরার ফ্ল্যাশের এক ফাঁকে কামাল বৃদ্ধের কব্জি স্পর্শ করে পালস বোঝার চেষ্টা করল। হাত একদম ঠাণ্ডা। কোনো পালস নেই।
ছবি তোলা শেষ হওয়ার পর ওসি বলল, ‘স্যার, মনে হচ্ছে মুখে বালিশ চেপে ধরে হত্যা করা হয়েছে।’
কামাল বলল, ‘অনেক কিছুই মনে হতে পারে। প্রমাণ ছাড়া কিছুই বলা যাবে না।’ মোজাম্মেলের দিকে চেয়ে বলল, ‘আপনার বাবার বয়স কত?’
‘সেভেন্টি প্লাস।’
‘উনি কি অসুস্থ ছিলেন?’
‘না। এমনকি উনার ডায়াবেটিসও ছিল না।’
‘শরীফ, উনার পা দুটো উঠাও তো দেখি।’
শরীফ পা দুটো একটু উঠাতেই বোঝা যায় বৃদ্ধ পায়খানা করে একদম মেখে ফেলেছেন। তবে সেগুলো শুকিয়ে গেছে।
কামাল মোজাম্মেলকে বলল, ‘কয়টায় উনি চিৎকার করেছিলেন?’
‘স্যার, ভোর চারটার দিকে।’ মোজাম্মেলের একই জবাব। তবে এবার কণ্ঠটা একটু কাঁপা কাঁপা মনে হলো কামালের।
‘কত বাজে ওসি সাহেব?’ কামাল জিজ্ঞেস করল।
‘স্যার, পাঁচটা পাঁচ, স্যার।’
‘এক ঘণ্টার মধ্যে কি এভাবে শুকিয়ে যাওয়া সম্ভব?’
‘সরি স্যার, আমার আইডিয়া নাই। এক্সপার্ট অপিনিওন নিতে হবে।’
কামাল কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকল। ঘরে তখন কান্নার শব্দ থেমে থেমে আসছিল, কিন্তু তার মন পুরোপুরি ঘরের ভেতরে আটকে গেছে। মৃত বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকিয়ে তার প্রথম যে জিনিসটা মনে হলো, সেটা মৃত্যু না, সময়। এই মানুষটা কখন মারা গেছে, সেই প্রশ্নের উত্তরই পুরো কেসের দিক ঘুরিয়ে দিতে পারে।
বিছানার পাশে ছোটো একটা সাইড টেবিল। তার ওপরে পানির গ্লাস। গ্লাসে অর্ধেক পানি। পাশে ওষুধের স্ট্রিপ। একটা পুরোনো ডায়েরি বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। টেবিলের কোণে একটা টর্চলাইট। আর ঠিক টেবিলের নিচে, মেঝের ওপর খুব ছোট্ট একটা ছোপ লেগে আছে। নিচু হয়ে তাকাতেই কামাল বুঝতে পারল, সম্ভবত নাক মুখ থেকে বের হওয়া লালা বা মিউকাস। শুকিয়ে গেছে।
কামাল উঠে দাঁড়িয়ে গ্লাসডোরের দিকে এগিয়ে গেল। কাচের ভাঙা অংশগুলো বেশিরভাগই বারান্দায় পড়ে আছে। ওসি আর শরীফ তখন লাশ, বালিশ, বিছানা এসব নিয়েই ব্যস্ত। কামাল কয়েক সেকেন্ড ধরে কাচের টুকরোগুলো দেখল। তারপর লক পরীক্ষা করল। গ্লাসডোর এখনও লক করা আছে। বাইরে সরু বারান্দা, তার পরে লোহার গ্রিল। গ্রিলের ফাঁক এতটাই কম যে একজন মানুষ ঢুকতে পারবে না। আর কাচ ভেঙে ঘরে ঢুকতে গেলেও কাচের দিক উল্টো হওয়ার কথা না। এখানে কাচের বড় অংশ বারান্দামুখী।
‘ওসি সাহেব,’ কামাল না ঘুরেই বলল, ‘এই কাচটা কি বাইরে থেকে ভাঙা হয়েছে? আপনার কী মনে হচ্ছে?’
ওসি একবার তাকিয়ে বলল, ‘দেখে তো তাই মনে হচ্ছে স্যার। মনে হয়, খুনি গ্লাসডোর ভেঙে ভেতরে ঢুকেছে।’
কামাল এবার ধীরে তার দিকে ফেরে। ‘খুনি যদি বাইরে থেকে কাচ ভেঙে ভেতরে ঢুকত, বড় টুকরোগুলো কোথায় বেশি থাকার কথা?’
ওসি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। শরীফও ক্যামেরা নামিয়ে তাকিয়ে আছে।
কামাল নিজেই বলল, ‘ঘরের ভেতর থাকার কথা। কিন্তু এখানে বেশিরভাগ বারান্দায় পড়ে আছে। তার মানে কাচটা ভেতর থেকে ভাঙা হয়েছে। খুনি প্রবেশের জন্য না, আমাদের দেখানোর জন্য কেউ কাচ ভেঙেছে।’
ঘরের ভেতর মুহূর্তেই যেন বাতাস বদলে গেল। মোজাম্মেল দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। সে চট করে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ‘স্যার, তাহলে কি খুনি এই পথে বাইরে গিয়েছিল?’
কামাল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, ‘শরীফ, দরজার লক, গ্লাসডোর, বিছানার চাদর, বালিশ, পানির গ্লাস, ডায়েরি, সবকিছুর ক্লোজ শট নাও। তারপর ঘরের বাইরে বারান্দারও নাও।’
কামাল বিছানার পাশে বসে মৃত বৃদ্ধের মুখের দিকে ভালো করে তাকাল। ঠোঁট সামান্য নীলচে। চোখ আধখোলা। মুখের কোণে শুকনো সাদা দাগ। মুখে সত্যিই বালিশ চাপা হয়ে থাকলে এরকম দাগ হতে পারে। কিন্তু শুধু মুখ চেপে ধরলেই হবে না। প্রশ্ন হলো, বৃদ্ধ চিৎকার করলেন কখন? আর যদি সত্যিই ভোর চারটায় চিৎকার করে থাকেন, তবে মৃতদেহের এই অবস্থা, ঠাণ্ডা হাত, আর শুকিয়ে যাওয়া মল কি তার সঙ্গে মেলে?
কামাল উঠে দাঁড়িয়ে মোজাম্মেলকে বলল, ‘আপনার বাবার সঙ্গে এই ফ্ল্যাটে আর কে কে থাকেন?’
‘আমি থাকি, স্যার। আমার স্ত্রী। আমার ছোটো বোন। আমার খালা। আর একজন কাজের মেয়ে আছে। ড্রাইভার থাকে নিচের সার্ভেন্ট রুমে, কিন্তু সে কাল রাতে ছিল না।’
‘আপনার বোনের বয়স?’
‘ত্রিশের কাছাকাছি।’
‘বিয়ে হয়নি?’
মোজাম্মেল একটু থামে। ‘না, স্যার।’
‘আপনার বাবার সঙ্গে কারও সম্পর্ক খারাপ ছিল?’
‘না স্যার। উনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন।’
এই উত্তরটা এত দ্রুত এলো যে কামালের সন্দেহ আরও বেড়ে গেল। যে মানুষ সত্তর পার করেছে, ব্যবসা করেছে, ছয়তলা বাড়ি করেছে, পরিবারের সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে, তার সঙ্গে অন্তত দুএকজনের হলেও সম্পর্ক খারাপ থাকার কথা।
‘খুব ভালো মানুষ’ কথাটা সাধারণত মৃতদের জন্য বলা হয়। সত্যের জন্য না।
কামাল বলল, ‘সবাইকে ড্রইংরুমে বসান। কেউ কোথাও যাবে না।’
দোতলার ফ্ল্যাটটা বেশ বড়। ঢুকেই ড্রইংরুম। ডানদিকে ডাইনিং আর কিচেন। বামদিকে লম্বা করিডোর। করিডোরের দুপাশে চারটা বেডরুম। করিডোরের শেষ মাথায় মাস্টার বেডরুম। দেয়ালে অনেকগুলো ফ্রেম করা ছবি। ড্রইংরুমে এসে কামাল দেখতে পেল এক মধ্যবয়সী নারী সোফার এক কোণে বসে আছে। মুখে কান্নার ছাপ, কিন্তু সেই কান্না যেন আটকে রাখা। আরেকজন বয়স্কা নারী তসবিহ হাতে বিড়বিড় করে দোয়া পড়ছে। একটু দূরে একটা মেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বয়েস তিরিশের কম না। গায়ের রং শ্যামলা, মুখ খুব ফ্যাকাশে। চোখের নিচে কালি। সে কাঁদছে না। বরং অদ্ভুত ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে সবার মুখ দেখছে।
কামাল প্রথমেই মেয়েটার দিকে তাকাল। মেয়েটাও তার দিকে তাকিয়ে রইল। ভয় আছে, কিন্তু সঙ্গে আরও কিছু আছে। ক্লান্তি? অবিশ্বাস? নাকি দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ?
‘আপনি?’ কামাল জিজ্ঞেস করল।
মোজাম্মেল বলল, ‘স্যার, আমার বোন নীলা।’
‘আপনি চিৎকার শুনেছিলেন?’
নীলা খুব আস্তে বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘ক’টায়?’
‘মনে হয় চারটার একটু আগে।’
মোজাম্মেল দ্রুত বলল, ‘চারটার দিকেই স্যার। আমরাও তাই শুনেছি।’
কামাল এবার শুধু একবার তার দিকে তাকাল। তারপর নীলাকে বলল, ‘আপনি কী ধরনের চিৎকার শুনলেন?’
নীলা কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল। ‘একবারই। খুব জোরে না। কিন্তু ভয় পাওয়া গলার মতো।’
‘তারপর?’
‘তারপর কিছু না।’
‘আপনি কি ঘর থেকে বের হয়েছিলেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘কোথায় গিয়েছিলেন?’
‘করিডোরে। ভাইয়াও বের হয়েছিল।’
‘আপনি কি আপনার বাবার দরজার কাছে গিয়েছিলেন?’
‘গিয়েছিলাম।’
‘দরজায় নক করেছিলেন?’
‘ভাই করেছিল।’
‘আপনি?’
‘আমি না।’
‘কেন?’
নীলা এবার মাথা তুলল। ‘তিনি জীবিত থাকলেও আমাদের অনেক কথার উত্তর দিতেন না। মরে গিয়ে তো আর দেবেন না।’
ড্রইংরুমের বাতাস যেন এক মুহূর্তে ঠান্ডা হয়ে গেল। মোজাম্মেল তীক্ষ্ণ গলায় বলল, ‘এই সময় এসব কথা বলার দরকার আছে?’
নীলা তার দিকে তাকাল না। শুধু বলল, ‘সত্য কথার দরকার সব সময়ই থাকে।’
কামাল মনের মধ্যে এই কথাটা রেখে দিল।
এরপর সে মোজাম্মেলের স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল। তার নাম রুবিনা। রুবিনার গলায় কান্না বেশি, উত্তর কম। কিন্তু তবু জানা গেল রাত সাড়ে দশটার দিকে সবাই রাতের খাবার খেয়েছে। বৃদ্ধ এরপর নিজে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। রুবিনা প্রায় প্রতিদিনের রুটিনের মতোই বলল। কাজের মেয়ে থালা বাসন গুছিয়েছে। এরপর সবাই ঘুমিয়ে গেছে। ভোরে চিৎকার শুনে বের হয়।
‘রাতে কি খাবার টেবিলে কোনো ঝগড়া হয়েছিল?’ কামাল জিজ্ঞেস করল।
রুবিনা সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘না, স্যার।’
কিন্তু ঠিক সেই সময় নীলা হালকা একটা হাসি হেসে ফেলল। তাচ্ছিল্যের হাসি।
কামালের চোখ এড়াতে পারল না। ‘আপনি হাসলেন কেন?’
নীলা বলল, ‘কারণ ভাবছিলাম, মানুষ কত সহজে মিথ্যে বলে।’
রুবিনা ভয়ে মুখ তুলে তাকাল। ‘আমি তো…’
‘খাবার টেবিলে কি ঝগড়া হয়নি?’ কামাল এবার সরাসরি নীলাকে বলল।
‘হয়েছিল,’ নীলা বলল। ‘বাবা আমাকে বিয়ে নিয়ে কথা শুনিয়েছেন। আবার।’
‘কী নিয়ে?’
‘আমি একটা ছেলেকে বিয়ে করতে চাই। বাবা রাজি না।’
‘কেন?’
‘কারণ ছেলেটার পরিবারকে তিনি ঘৃণা করেন।’
‘কেন?’
নীলা এবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। বয়স্কা খালা তসবিহ ঘোরাতে ঘোরাতে মাথা নিচু করে আছে। মোজাম্মেলের মধ্যে স্পষ্ট অস্থিরতা দেখা যাচ্ছিল।
‘ত্রিশ বছর আগের একটা ব্যাপার,’ নীলা বলল। ‘জমি নিয়ে।’
‘আপনি বিস্তারিত জানেন?’
‘যতটা শুনেছি, বাবা এক লোকের সর্বনাশ করেছিলেন। মামলায় জড়িয়েছিলেন। তাদের জমি খুব কম দামে নিয়ে নিয়েছিলেন।’
মোজাম্মেল এবার গর্জে উঠল। ‘তুই আবার শুরু করলি?’
কামাল বলল, ‘আপনি চুপ থাকেন। উনাকে বলতে দিন।’
নীলা বলল, ‘যে ছেলেটাকে আমি বিয়ে করতে চাই, সে ওই লোকের ছেলে।’
‘নাম?’
‘শহীদ।’
কামাল ধীরে মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করল, ‘হুমকির চিঠিটা কি এই শহীদের কাছ থেকে আসতে পারে?’
মোজাম্মেল তড়িঘড়ি করে বলল, ‘হতে পারে, স্যার। আমরাও তাই ভাবছি।’
নীলা এবার তীক্ষ্ণ চোখে ভাইয়ের দিকে তাকাল। ‘তুই অনেক কিছুই ভাবিস।’
কামাল নীলার কথাটা মনোযোগ দিয়ে শুনল।
সকাল ছয়টার দিকে ফরেনসিকের প্রাথমিক টিম ঘরে কাজ শেষ করল। বালিশ, বিছানার চাদর, দরজার লক, গ্লাসডোর, মেঝের দাগ, সব সংগ্রহ করা হলো। শরীফ এসে নিচু গলায় বলল, ‘স্যার, দরজার লকটার নিচে স্ক্র্যাচ আছে। পাতলা কিছু ঢুকানো হয়ে থাকতে পারে।’
কামাল যেন সেটাই আশা করছিল। ‘ফটো নিয়েছ?’
‘জি স্যার।’
‘ভালো। এখন হুমকির চিঠিটা দেখাতে বলো।’
মোজাম্মেল চিঠিটা এনে দিল। সস্তা, সাদা কাগজ। হাতে লেখা। কিন্তু লেখাটা ইচ্ছে করে বিকৃত করা। তাতে লেখা:
“সাতদিন সময়। পুরোনো হিসাব নতুন করে হবে। বাড়ির ভেতরেই হবে।”
তারিখ ১৭ জুলাই।
কামাল কাগজটা হাতের কাছে নিয়ে অনেকক্ষণ দেখল। কালি এক রকম না। দুটো পেন ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথম লাইন আর শেষ লাইন আলাদা। যারা ছদ্মবেশী চিঠি লেখে, তারা অনেক সময় এ রকম করে। সে চিঠিটা খামে ভরে নিল।
তারপর সে হঠাৎই বলল, ‘আপনাদের বিল্ডিংয়ে সিসিটিভি আছে?’
দারোয়ান বলল, ‘গ্যারেজে আছে স্যার। লবিতে আছে। বাসার বাইরে রাস্তার দিকে মুখ করা একটা আছে।’
‘দোতলার করিডোরে নেই?’
‘না, স্যার।’
‘গত রাতের ফুটেজ এখনই লাগবে।’
দারোয়ান নিচে ছুটে গেল।
সকাল একটু একটু করে উঁকি দিচ্ছে। বৃষ্টিটাও থেমে এসেছে। কিন্তু এই বাসার ভেতরে সময় যেন আটকে আছে। কান্না শুকিয়ে গিয়ে এখন ভয় হয়ে বসে আছে। সেই ভয় সবচেয়ে বেশি কার চোখে, সেটা কামাল পর্যবেক্ষণ করছিল।
ফুটেজ আসতে সময় লাগল। এই ফাঁকে কামাল আবার মাস্টারবেডে ঢুকল। এবার আরও মন দিয়ে দেখল ঘরটা। বিছানার চাদর বেশ টানটান। যে মানুষ বিছানায় শুয়ে বালিশ চাপা খেয়ে মরেছে, সেখানে এত গুছানো চাদর থাকা অস্বাভাবিক। হালকা স্ট্রাগল হলেও ভাঁজ, কুঁচকানো, টান পড়ার কথা। এখানে সেই লক্ষণ খুব কম। বরং মনে হচ্ছে মৃত্যুর পরে বিছানাটা একটু ঠিক করা হয়েছে।
বালিশ দুটোও সমান না। একটা মাথার কাছে, আরেকটা খুব পরিষ্কারভাবে পাশে। যদি বালিশ চাপা দেওয়া হয়, সাধারণত যে বালিশ ব্যবহৃত হয় তাতে চাপ, ভাঁজ, লালা, নাকের পানি, কিছু না কিছু থেকে যায়। ফরেনসিকই বলবে। কিন্তু ঘরটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে, দৃশ্য তৈরি করা হয়েছে।
‘শরীফ,’ কামাল বলল, ‘এই বিছানা কে গুছিয়েছে, তা খুঁজে বের করতে হবে।’
শরীফ বলল, ‘মার্ডারের পরে কেউ গুছিয়েছে স্যার?’
‘অথবা মার্ডারের অংশ হিসেবেই গুছানো হয়েছে।’
ঘর থেকে বেরিয়ে সে খালাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার নাম?’
‘সিফাত আরা।’
‘আপনি মৃতের কী হন?’
‘শালিকা।’
‘আপনি কতদিন ধরে এই বাসায়?’
‘দুই বছর।’
‘গতকাল রাতে কিছু অস্বাভাবিক দেখেছেন?’
সিফাত আরা হাতের তসবিহ থামালেন। ‘দুলাভাই রাতে ঘুমাইতে যাওয়ার আগে বলেছিল, আজ যদি কিছু হয়, কেউ বিশ্বাস করবে না। আমি বলাম, কী হবে? সে বলল, পুরান পাপ মানুষকে মেরে ফেলে। তাই না?’
ঘরে সবাই চুপ হয়ে গেল।
‘আপনি কি আগে এই কথা শুনেছেন?’ কামাল বলল।
‘অনেকবার। কিন্তু সে সব খুলে বলত না। শুধু ভয় পেত।’
‘কাকে?’
‘বলত, কেউ আছে। রাতের বেলা জানালার পাশে দাঁড়ায়।’
কামাল আবার মাস্টারবেডের গ্লাসডোরের দিকে তাকাল। বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে দেখার মতো ব্যবস্থা আছে কি না।
সাড়ে সাতটার দিকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখা হলো। রাত সাড়ে দশটার পরে বাইরে থেকে কেউ ঢোকেনি। কেউ বেরও হয়নি। গ্যারেজে দারোয়ান মাঝরাতে একবার চা খেতে গিয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো অচেনা মানুষ দেখা যাচ্ছে না। লবিও ক্লিয়ার। অর্থাৎ খুনি বাইরের কেউ হলে আগেই ঢুকেছিল। না হলে ভেতরের কেউ।
কামাল বলল, ‘এখন প্রত্যেকের রুম দেখি।’
প্রথমে মোজাম্মেলের রুম। বেশ পরিপাটি। কাপড়চোপড় গুছানো। কিন্তু বাথরুমের ঝুড়িতে একটা হালকা নীল রঙের শার্ট। একটা বোতাম নেই। কামাল সেটা হাতে নিয়ে শান্তভাবে দেখল। রুবিনা তখন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। তার চেহারায় এমন একটা আতঙ্ক দেখা গেল, যা আগের কান্নার চেয়ে বেশি বাস্তব।
‘এই শার্টটা কার?’ কামাল জিজ্ঞেস করল।
মোজাম্মেল বলল, ‘আমার।’
‘বোতাম কোথায়?’
‘খেয়াল করি নাই।’
‘কখন খুলে রেখেছেন?’
‘রাতে। ঘুমানোর আগে।’
কামাল কোনো কথা না বলে শার্টটা প্যাকেট করতে বলল।
তারপর নীলার ঘর। এই ঘর অন্যরকম। বই আছে অনেক। টেবিলে কিছু ফাইল। একটা ছোটো লোহার আলমারির ওপর পুরোনো দলিলের কপি। কামাল সেগুলো উলটে পালটে দেখল। জমির নকশা, নামজারি কাগজ, পুরোনো রেকর্ডের ফটোকপি। কিছু উইলের খসড়া। নীলা কিছু লুকাল না। বরং বলল, ‘আমি এগুলো খুঁজছিলাম। প্রমাণের জন্য।’
‘কী প্রমাণের জন্য?’
‘বাবা কী করেছিলেন, তা প্রমাণ করার জন্য।’
‘শহীদের জন্য?’
‘হ্যাঁ।’
‘আপনি কি গতরাতে স্টোররুমে গিয়েছিলেন?’
নীলা চুপ। তারপর বলল, ‘গিয়েছিলাম।’
‘কয়টায়?’
‘রাত বারোটার পর।’
‘কেন?’
‘পুরোনো দলিল খুঁজতে।’
‘বাবা জানতেন?’
‘সম্ভবত।’
‘তাহলে চিৎকার কি আপনার যাওয়ার সময় হয়?’
‘না। তখন না। আমি ওনার ঘরে যাইনি।’
‘কেউ আপনাকে দেখেছে?’
‘জানি না।’
কামাল মাথা নেড়ে বলল, ‘আপনি সত্যের খুব কাছে, কিন্তু খুনের খুব কাছে নাও হতে পারেন। আবার উল্টোটাও হতে পারে।’
নীলা তার দিকে তাকিয়ে রইল। ‘আমি বাবাকে ঘৃণা করতাম। কিন্তু মেরে ফেলিনি।’
‘ঘৃণা স্বীকার করার সাহস সবার থাকে না,’ কামাল বলল। ‘এটা আপনার পক্ষে যায়। আবার সবসময় যায়ও না।’
সকাল এগারোটার দিকে ফরেনসিক এক্সপার্ট এলো। কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করার পর বলল, ‘স্যার, প্রাইমা ফেসি মনে হচ্ছে মৃত্যু রাত দুইটার দিকেই হয়েছে। চারটার দিকে না। মুখে কিছু চেপে ধরা হয়েছে। তবে শেষ নিশ্চিত বলতে পোস্টমর্টেম লাগবে। আর মলত্যাগ মৃত্যুর কাছাকাছিই হয়েছে, কিন্তু সময় হিসেবে অন্তত দুই ঘণ্টা আগে।’
কামাল ফোন কেটে শরীফের দিকে তাকাল। ‘শুনলে?’
শরীফ বলল, ‘মানে চারটার চিৎকারটা…’
‘মিথ্যে, অথবা অন্য কিছুর আওয়াজ।’
‘তাহলে সবাই মিলে মিথ্যে বলছে?’
‘না। একজন মিথ্যে বলেছে। বাকিরা সেই গল্পে জুড়ে গেছে, কারণ ভয় পেয়েছে বা নিশ্চিত ছিল না।’
এখন কেসটা অনেকটাই পরিষ্কার হতে শুরু করেছে, কিন্তু এখনও একটা জট আছে। চারটার দিকে চিৎকার শুনেছে বলে সবাই কেন বলছে? কেউ কি ইচ্ছে করে সেই শব্দ তৈরি করেছে, যেন মৃত্যু সেই সময় হয়েছে বলে মনে হয়?
দুপুরের আগেই কামাল সবাইকে আবার ড্রইংরুমে ডাকল। বাইরে রোদ উঠেছে।
‘আমি কিছু প্রশ্ন আবার করব,’ সে বলল। ‘এবার সবাই ভেবে উত্তর দেবেন। দ্রুত না।’
সে প্রথমে মোজাম্মেলকে বলল, ‘আপনি কি নিশ্চিত চারটার দিকেই চিৎকার শুনেছেন?’
‘জি।’
‘কী ধরনের চিৎকার?’
‘একটা… একটা আহ্ এর মতো।’
‘আপনি কি আপনার বাবার গলা চিনতে পেরেছিলেন?’
‘অবশ্যই।’
‘তবু বলতে পারছেন না শব্দটা কেমন ছিল?’
মোজাম্মেল চুপ।
কামাল এবার রুবিনাকে জিজ্ঞেস করল। ‘আপনি?’
‘আমি ঘুমিয়ে ছিলাম স্যার। শব্দ শুনে উঠে পড়ে।’
‘আপনি কি সঙ্গে সঙ্গে বের হয়েছিলেন?’
‘জি।’
‘নাকি আপনার স্বামী আগে বের হয়েছিল?’
রুবিনা এবার থেমে গেল। ‘হয়তো ও আগে উঠছিল।’
‘হয়তো?’
‘জি।’
কামাল এবার নীলার দিকে ফিরল। ‘আপনি চারটার দিকে যে শব্দ শুনেছেন, সেটা কি মানুষের চিৎকার ছিল, নাকি কোনো কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দও হতে পারে?’
নীলা একটু ভেবে বলল, ‘আমি… নিশ্চিত না। তখন মনে হয়েছিল মানুষের। এখন মনে হচ্ছে দরজায় ধাক্কার মতোও হতে পারে।’
কামাল মাথা নেড়ে সিফাত আরাকে জিজ্ঞেস করল। ‘আপনি শুনেছিলেন?’
‘আমি স্পষ্ট শুনি নাই। পরে ডাকাডাকি শুনছি।’
শরীফ পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ওসি এবার স্পষ্ট বুঝতে পারছে, গল্পের সেলাই আলগা হয়ে গেছে।
কামাল ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার গলার স্বর বদলায়নি, কিন্তু ঘরে বসা সবাই বুঝল, এখন আসল অংশ শুরু হচ্ছে।
‘মৃত্যু ভোর চারটায় হয়নি,’ সে বলল। ‘প্রাথমিক মতামত বলছে রাত দুইটার দিকেই মৃত্যু হয়েছে। মৃতদেহের অবস্থাও তাই বলছে। মল শুকিয়ে যাওয়া, শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, সবই। চারটার চিৎকারের গল্প তাই মিথ্যে। বা অন্তত বিভ্রান্তিকর।’
মোজাম্মেল মুখ তুলে বলল, ‘স্যার, আমরা যা শুনেছি তাই বলছি।’
‘না,’ কামাল বলল। ‘আপনি যা বানিয়েছেন তাই বলছেন।’
ঘরে একসঙ্গে কয়েকটা নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
‘আপনার হালকা নীল শার্ট থেকে একটা বোতাম নেই। মৃতের বিছানার পাশে আমি একই ধরনের একটা বোতাম পেয়েছি। আপনার শার্টে কাচের গুঁড়ো আছে, যা দরজা ভাঙার সময় লেগেছে। লকের নিচে স্ক্র্যাচ আছে। ধাতব কিছু ঢুকিয়ে লক নাড়ানো হয়েছে। গ্লাসডোর বাইরে থেকে ভাঙা। দৃশ্য সাজানো হয়েছে। আর বিছানা মৃত্যুর পরে গুছানো হয়েছে। এগুলো কোনোটাই বাইরের খুনি এসে করতে পারে না, কারণ সিসিটিভিতে কেউ নেই।’
মোজাম্মেলের ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। রুবিনা কাঁপছে। নীলা শুধু তাকিয়ে আছে। তার চোখে কান্না নেই, কিন্তু একরকম অবসন্ন নিশ্চয়তা আছে। যেন সে জানত, কিছু একটা বের হবেই।
কামাল এবার আরও নিচু গলায় বলল, ‘আপনার বাবা উইল বদলাতে চেয়েছিলেন। তা কি সত্যি?’
রুবিনা হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠল। মোজাম্মেল তবু চুপ।
‘নতুন উইলে আপনার অংশ কমে যেত,’ কামাল বলল। ‘আপনার বোনকে বেশি দেওয়া হতো। আর কিছু অংশ দান করার কথাও ছিল। আমি নিশ্চিত গতকাল রাতে খাবার টেবিলে এই নিয়ে তর্ক হয়েছে। তারপর বোনের বিয়ের ব্যাপারেও ঝগড়া হয়েছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাগ জমেছে।’
মোজাম্মেল এবার দাঁড়িয়ে উঠল। ‘প্রমাণ আছে?’
‘আছে, আপনার বোনের টেবিলে উইলের খসড়া দেখেছি। আপনার বাবা সম্ভবত ঘুমিয়ে ছিলেন বা আধঘুমে ছিলেন। আপনি রাত দুইটার দিকে তার ঘরে ঢোকেন। হয়তো কথা বলতে। হয়তো উইল নিয়ে তর্ক করতে। হয়তো সরাসরি লড়াই হয়নি। বৃদ্ধ মানুষ, আর আপনি তার ছেলে। তিনি পুরো জোরে প্রতিরোধও করতে পারেননি। মুখে বালিশ চাপা দিলে শারীরিক স্ট্রাগল কমই হয়। তখন বোতাম ছিঁড়ে গিয়েছে। মলত্যাগ হয়েছে। তারপর আপনি দৃশ্য সাজাতে থাকেন। বিছানা কিছুটা ঠিক করেন। গ্লাসডোরের কাচ ঘরের ভেতর থেকে ভাঙেন। তারপর ভোর চারটার দিকে একটা জোরে শব্দ করেন বা দরজায় ধাক্কা দিয়ে সবার ঘুম ভাঙান। যেন মনে হয় তখনই কিছু হয়েছে।’
রুবিনা এবার কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল, ‘আমি বলছিলাম ওকে, এটা করো না! আমি আগেই বলছিলাম!’
ঘরের ভেতর যেন সব শব্দ একসঙ্গে থেমে গেল।
মোজাম্মেল ধীরে তার স্ত্রীর দিকে ফিরল। তার মুখে এমন এক দৃষ্টি, যেখানে রাগ নেই, শুধু ধরে রাখা ভাঙন।
কামাল বলল, ‘রুবিনা, আপনি জানতেন?’
‘আমি… আমি মারতে বলিনি স্যার,’ রুবিনা কাঁদতে কাঁদতে বলল। ‘রাতে ও অনেক রেগে ছিল। আব্বা বলছিল, ‘আর টাকা দেবে না। ঋণ পরিশোধ করবে না। উইল করবে। তারপর রাত দুইটার পরে আমি দেখি ও বিছানায় নেই। কিছুক্ষণ পর আসে। খুব ঘেমে ছিল। বলে, কিছু হয় নাই। পরে ভোরে নিজেই ধাক্কাধাক্কি শুরু করে।’
‘আপনি কাউকে বলেননি কেন?’
রুবিনা মাথা নিচু করল। ‘আমি ভয় পেয়েছিলাম।’
কামাল এবার মোজাম্মেলের দিকে তাকাল। ‘ আপনি কিছু বলবেন? নাকি পোস্টমর্টেম, ফাইবার, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, সব আসার পর বলবেন?’
মোজাম্মেল অনেকক্ষণ চুপ। এতটাই চুপ যে মনে হচ্ছিল, সে হয়তো আর কোনোদিন কথা বলবে না। তারপর ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়ল। দুই হাত মুখে চাপল। কাঁধ কাঁপছে। কিন্তু এই কান্না আর আগেরটা এক না। আগেরটা ছিল অভিনয়ের কাছাকাছি। এটা একদম ভেতর থেকে আসছে।
‘আমি মারতে চাই নাই,’ সে বলল। গলা ভাঙা। ‘আমি শুধু ভয় দেখাইতে গিয়েছিলাম। কাগজপত্র বদলাইতে বলেছিলাম। আব্বা আবার সেই একই কথা বলল। বলল, আমি অকর্মা। আমার জন্য নাকি এই বাড়ির সর্বনাশ হবে। রাগ উঠল। বালিশ ধরি… ধরে রাখি… তারপর আর…’
সে কথা শেষ করতে পারল না।
নীলা চোখ বন্ধ করল। তার মুখে শোক না, মুক্তির মতো এক ধরনের ক্লান্তি ফুটে উঠল। যেন বহুদিনের জমে থাকা নোংরা সত্য অবশেষে উচ্চারণ হলো।
‘তারপর?’ কামাল বলল।
মোজাম্মেল বলল, ‘মরে গেছে বুঝে ভয় পাই। ভাবলাম, ঐ চিঠির উপর দোষ চালাইয়া দিলে বেঁচে যাব। বারান্দার কাচ ভাঙি। পরে সবাইকে জাগাই।’
‘চিৎকার?’
‘আমি দরজায় জোরে ধাক্কা দিছি। রুবিনা ঘুম থেকে উঠে ভয় পেয়েছে। পরে আমি বলছি, আব্বার চিৎকার শুনছি।’
কামাল চুপ করে রইল। এ ধরনের স্বীকারোক্তির পর ঘর খুব তাড়াতাড়ি ফাঁকা লাগে। মানুষ ঠিক একই থাকে, কিন্তু তাদের মুখের আকার বদলে যায়। রুবিনা কান্নায় ভেঙে পড়ে। সিফাত আরা তসবিহ হাতে দোয়া পড়তে পড়তে কাঁদে। নীলা জানালার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখে পানি আসে অনেক পরে।
দুপুরের পরে শহীদকে ডেকে আনা হয়। সে এসে চিঠি লেখার কথা স্বীকার করে। কিন্তু খুনে জড়িত না থাকার পক্ষে তার অ্যালিবাইও মেলে। সে বলল, ‘আমি চেয়েছিলাম সে ভয় পাক। সে যেন জানে, অন্যায়ের শেষ আছে। কিন্তু আমি মারিনি।’
কামাল মাথা নেড়ে বলল, ‘তোমার চিঠি ভয় তৈরি করেছে। খুন করেছে অন্য কেউ। তবে এক অর্থে পুরোনো অন্যায়ও এই খুনের অংশ।’
শহীদ চুপ করে রইল। তার চোখে প্রতিশোধের জয়ের আনন্দ নেই। কারণ সত্যি কথা হলো, পুরোনো পাপের বিচার আদালতে হয়তো হয় না, কিন্তু তা পরিবারের ভেতরের বিষ হয়ে থেকেই যায়।
বিকেলের দিকে লাশ পাঠানো হলো। ফ্ল্যাট ধীরে ধীরে নীরব হয়ে এলো। পুলিশের আনাগোনা কমে গেল। কনস্টেবলরা মোজাম্মেলকে নিয়ে নিচে নামছে। নামার সময় সে একবার বোনের দিকে তাকাল। নীলা তাকাল না। শুধু বলল, ‘তুই বাবার মতোই হইলি। পার্থক্য শুধু সময়।’
কামাল শুনেও মুখে কিছু আনল না। তবে কথাটা তার মনে রয়ে গেল। সে ভাবল, এই বাড়ির গল্প আজ শুরু হয়নি । আজ শুধু শেষ দৃশ্যটা দেখা গেল। একজন বৃদ্ধ, যিনি অন্যায় করে বেঁচে ছিলেন, শেষে নিজের ভয়ের ভেতরেই মারা গেলেন। আর যে ছেলে বাবার অন্যায় দেখে বড় হয়েছে, সে নিজের স্বার্থে বাবাকেই মেরে একই অন্ধকারে ডুবে গেল।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে শরীফ বলল, ‘স্যার, আপনি প্রথম কী দেখে বুঝলেন সময়টা মিলছে না?’
কামাল বলল, ‘মল শুকিয়ে যাওয়া, শরীরের ঠাণ্ডা, আর সবচেয়ে বড় কথা, চারটার চিৎকারের গল্পটা খুব পরিষ্কার ছিল। সত্যি ঘটনা মানুষ গুলিয়ে ফেলে। বানানো ঘটনা সবাই একইভাবে বলে।’
শরীফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল, ‘আর কাচ?’
‘খুব বেশি নাটক ছিল। খুনি ভাবছিল অসম্ভব রহস্য বানাবে। কিন্তু অসম্ভব রহস্য সাধারণত অতিরিক্ত চেষ্টা করলেই ভেঙে যায়।’
বাইরে এসে দেখা গেল বৃষ্টি একেবারে থেমে গেছে। আকাশের মেঘ পাতলা হয়ে এসেছে। মানুষজন স্বাভাবিক দিনের কাজ শুরু করে দিয়েছে। কেউ জানে না, এই ছয়তলা বাড়ির দোতলায় কয়েক ঘণ্টা আগেও একটা সাজানো গল্পের ভেতর সত্য লুকিয়ে ছিল।
গাড়িতে ওঠার আগে কামাল আরেকবার বাড়িটার দিকে তাকাল। অসংখ্য টব ঝুলছে বারান্দায়। টবগুলো সত্যিই পুরোনো। অনেকদিন ধরে একই জায়গায় আছে। মানুষের ভেতরেও তেমন কিছু পুরোনো জিনিস থাকে। পুরোনো অন্যায়, জমে থাকা অপমান, উত্তরাধিকার, লোভ, ভয়। একদিন সেগুলোই খুন হয়ে বের হয়। গাড়ির দরজা বন্ধ হলো। ইঞ্জিন স্টার্ট নিল।
মিরপুর ৬ নম্বর সি ব্লকের ১৫ নম্বর রোড-এর ৮৬/৩ নম্বর বাসাটা পেছনে সরে যেতে লাগল।
সৃজন
ঈদসংখ্যা ২০২৬
১৯ মার্চ ২০২৬
![]()