উদ্ধার কাজ সমাপ্ত
মাথার ঝিমঝিম ভাব কিছুটা কমেছে। অনেকটা হালকা লাগছে। কিন্তু কোথায় যেন খেই হারিয়ে ফেলছি। সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। একবার মনে হয়, আমি ভেসে যাচ্ছি। পরক্ষণেই আবার মনে হয়, আমি ডুবে যাচ্ছি। এই ভেসে যাওয়া আর ডুবে যাওয়ার মাঝেই যেন হাজার বছর ধরে ভাবনার পর মহাশূন্যের অসীম জগত থেকে এইমাত্র খুঁজে পেলাম আমার নাম ‘কাজল’।
কিন্তু শুধু ‘কাজল’-কেই উদ্ধার করা গেল। তারপর আবারো পেরিয়ে গেল যুগের পর যুগ।
হঠাৎ একটা ছোট্ট হাতের কোমল স্পর্শে মস্তিষ্কের কোষগুলো যেন প্রাণ ফিরে পায়। সে স্পর্শ এখনও আমার মুখমণ্ডল জুড়ে। আমার পরী। আমার তিন বছরের মেয়ে। পরীর জন্মের পর রক্তের ছোপ লেগে থাকা ছোট্ট শরীরটাকে আমার হাতে তুলে দিয়ে ওর মা বলেছিল, আমি সুন্দরী নই বলে অনেক কষ্ট তোমার। এই নাও, এই পরীকে বুকে নিয়ে জ্বালা জুড়াও।
ওর কথা মিথ্যা হয়নি। পরী আমার বুকে ছিল। পরীর মা…… পরীর মাও ছিল।
তারপর আবার সেই ঝিমঝিম ভাব। মনে হয় পানিতে ভাসছি। ঢেউয়ের তালে তালে মাথাটা দুলছে। আলোর তীব্র ঝলকানিতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায়। তারপর ঝটপট রেডি হয়ে হটপট-এ খাবার নিয়ে মেয়েটাকে আদর করে পাবলিক বাসে চেপে অফিসে। ঝিমুনি মাথায় নিয়েই অফিস শেষে ওভারটাইম। তারপর সোজা ফ্লাইওভারের নিচে, করম আলীর ভ্যানের সামনে হাজিরা। মধ্যবিত্তের ভ্রাম্যমান বাজার।
করম আলী জানে, আমি তার থেকেই সবজি কিনব। আমিও জানি যে, করম আলী ছাড়া আমার কাছে কোনো বিকল্প নাই। তারপরও যদি দু-এক টাকা বাঁচানো যায়। মধ্যবিত্তের সীমাহীন লোভ! যদি কিছু টাকা বাঁচানো যায়! আরও আছে অবিশ্বাসের সূক্ষ্ম এক দেয়াল, ‘লোকটা যদি ঠকায় আমাকে’। তাইতো চার-পাঁচ ভ্যান ঘুরে বর্তমান বাজার দর ও পণ্যের তুলনামূলক মান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তারপর কেনার প্রসঙ্গ।
সব যাচাই-বাছাই শেষে যখন করম আলীর ভ্যানের সামনে গিয়ে দাঁড়াই, তখন তার মুখ থেকে ভেসে আসে সেই পরিচিত শব্দমালা, “আপনারে যদি ঠকাই, তাইলে ওই ফিলাই-ওভার যেন আমার মাথার উপর ভাইঙ্গা পড়ে।”
“আরে না, কী কও! কত নামীদামী ইঞ্জিনিয়ার এটা বানাইছে, জানো তুমি? একশ বছরের গ্যারান্টি! তার আগে কিচ্ছু হবে না। বড়ো ভূমিকম্প এলেও কোনো সমস্যা নাই। ভেঙে পড়ার কোনো চান্স নাই। তুমি আমাকে ঠকালেও ভাঙবে না, আবার না ঠকালেও ভাঙবে না।”
মুখে কিছু হবে না বললেও ভয়টা ঠিকই কাজ করে। মাথাটা কেঁপে ওঠে। কানের পাশ দিয়ে ঘাড় পর্যন্ত শির শির করে। যদি সত্য সত্যই ভেঙে পড়ে। মনে হয় কোনো সমস্যা হবে না। অনেক উঁচু। নিচে পড়তে পড়তেই দৌড় দিয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়া যাবে।
দৌড় শুরু করার আগেই মাথাটা দুলতে থাকে। বাড়ির সামনের বড়ো আমগাছটার ডালে রশি বেঁধে বানানো দোলনায় দোল খাওয়ার মতো। একবার সামনে, আরেকবার পেছনে। দোলনার দুলুনি মাথায় নিয়েই দৌড়। আমি দৌড়াচ্ছি। স্বপ্নের দৌড়ের মতো। হঠাৎ করেই মনে হলো, আমি যেন সাদা স্কুল ড্রেস পরে আছি। ১০০ মিটার দৌড়। চারিদিকে হৈ চৈ। সব ছাপিয়ে বাঁশির শব্দ। দৌড়। দৌড়। দৌড় আর শেষ হতে চায় না। আরেকটু সামনে গেলেই লাল ফিতা। সবার আগে ফিতা স্পর্শ করেও আমি দৌড়াতে থাকি। আমি থামতে চাইলেও আমার শরীর যেন থামতেই চাইছে না। বশির স্যার শক্ত হাতে লাল ফিতা ধরে আছে তখনো। ফিতাটা আমার গলায় বেঁধে গেছে। গলায় ফাঁস লেগে যাওয়ার মতো। দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আমার। আমি চিৎকার করে বলি, “স্যার, ফিতাটা ছেড়ে দেন। আমার গলা কেটে যাবে।”
হঠাৎ মনে পড়ে, দাদা বলেছিল জাম-পুকুরে মাছ ধরবে। ভুলে গিয়েছিলাম, আমার জাল নিয়ে যাওয়ার কথা। চিকন ফাঁসের জাল। জালের ফাঁসে মলা মাছের মাথা খুব সহজেই আটকে যায়। জাল পানি থেকে উঠানোর পর সোজাসুজি খুললে ভালো। না খুললে মলার শরীর শক্ত করে ধরে রেখে হ্যাঁচকা টান। এক টানে মাথা আলাদা।
দৌড়। দৌড়। সামনে যে পুকুরটা পড়ল তা আসলে পুকুর নয়, একটা দীঘি। মানিক বলে, “পুকুরে তো খুব সহজে ডুব দিয়ে তলার মাটি উঠাতে পারিস। দীঘি থেকে মাটি উঠাতে পারবি? তোকে চ্যালেঞ্জ। তোর এই ক্ষমতা নাই। তুই পারবি না।”
আমি দৌড়াতে দৌড়াতেই দীঘির পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। তারপর পানির নিচে যেতে যেতে যেতে একসময় যখন শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, তখন মনে হয় কোনোরকমে শুধু মাথাটা পানি থেকে বের হলেই বেঁচে যাই। শেষ চেষ্টা নিয়ে আরও একবার হাতটা যতদূর সম্ভব নিচে বাড়িয়ে কিছুটা কাদা মাটি নিয়ে আবার প্রাণপণে উপরে উঠতে উঠতে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে পানির উপরে ভুস করে মাথাটা বের করে দিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচি।
দীঘি থেকে উঠেই আবার দৌড়। আমি দৌড়াচ্ছি। মাথার ঝিমঝিম ভাবটা আবার ফিরে এসেছে। পা দুটো ক্লান্ত হয়ে চলার শক্তি হারিয়ে ফেলছে। মনে হয়, পা আর কাজ করছে না।
আমি দৌড়াচ্ছি। ভীষণ খারাপ লাগছে। মনে হয় জ্ঞান হারিয়ে ফেলব। তারপরও দৌড়াতে হচ্ছে। উপায় নেই। বাঁচতে হলে দৌড়াতে হবেই। একসময় মনে হয় পা ছাড়াই দৌড়ে চলেছি।
আমি দৌড়াচ্ছি। অনন্তকাল ধরে দৌড়াচ্ছি।
হঠাৎ মনে হয়, পরীর মাকে কল করে জানাতে পারি, আমার খুব খারাপ লাগছে। বিশেষ করে গলার দিকটায় অস্বস্তি লাগছে। পরী অথবা পরীর মা একটু হাত বুলিয়ে দিলেই আরাম পেতাম।
কল দিতে গিয়েই চমকে উঠলাম, আমার মোবাইল ফোন কোথায়? মোবাইল ফোন তো সারাক্ষণ হাতেই থাকে!
মাথায় প্রচণ্ড শব্দের একটা ঝাঁকুনি লাগে। আমার হাত কোথায়? আমার হাত!
আমার শরীর কোথায়? আমার শরীর!
আমি আর্তনাদ করে উঠি…… “পরী! মা আমার!”
শব্দের তাড়নায় পানিতে ঢেউ জাগে। সেই ঢেউয়ে আমার দেহ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া মাথাটা ভাসতে থাকে।
(গল্পের প্রেরণাঃ
চট্টগ্রামে উড়ালসড়কের গার্ডার ভেঙে নিহত ৪
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
২৫ নভেম্বর ২০১২, ০৬: ০০
চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট জংশনে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় নির্মাণাধীন একটি উড়ালসড়কের (ফ্লাইওভার) তিনটি গার্ডার নিচে ভেঙে পড়ে অনেক লোক হতাহত হয়েছে। দুটি গার্ডারের নিচে তিনজনের খণ্ডবিখণ্ড লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী যান্ত্রিক কারিগর জনাব শামসুল আলম এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এশারের আজানের ধ্বনি ভেসে আসার সময় বহদ্দারহাট পুকুর পাড়ের অদূরে দুই পিলারের মাঝামাঝি তিনটি গার্ডার ভেঙে পড়ে। এ সময় বিকট শব্দ হয়।
গার্ডার ভেঙে পড়ার আগ মুহূর্তে ওই জায়গায় ভাসমান তরকারিবিক্রেতা ও ক্রেতা মিলিয়ে আট-দশজন ও পুকুর পাড়ে আরও অনেকে আড্ডা দিচ্ছিলেন। আসলে তাঁদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা আর বলতে পারছি না।’ )
(প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, শালুক, রূপান্তরিত পাঠশালায় অনিবার্য কাফকা)