সম্পর্ক
এক
শপিং থেকে ফিরে বেডরুমে ঢুকেই নীলা দেখল তার স্বামী মেঝেতে পড়ে আছে।
তার দম বন্ধ হয়ে এল।
আরিফের দেহ বিছানার পাশেই মেঝেতে পড়ে আছে। মুখটা দরজার দিকে ঘুরানো। ডান হাতটা পেটের ওপর অস্বস্তিকর ভাবে রাখা। বাঁ হাতটা প্রসারিত। আঙুলগুলো সামান্য ভাঁজ করা। চোখ অর্ধেক খোলা। ফাঁকা দৃষ্টি। দরজার দিকে আটকে আছে।
এটা কী দেখছে নীলা! কিছুক্ষণের জন্য হলেও তার মনটা মানতেই চাইল না।
হাতের শপিং ব্যাগটা মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিল সে।
“আরিফ!” তার গলা থেকে যে শব্দ বের হলো তাতে নিজেই অবাক হয়ে গেল নীলা।
সে ছুটে গিয়ে তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। কাঁপতে থাকা হাতটা দিয়ে আরিফের বাহু স্পর্শ করল। ঠাণ্ডা হয়ে আছে। কিন্তু কোনো নড়াচড়া নেই। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
“আরিফ!” নীলা চিৎকার করে উঠল। তার শরীরটাকে জোরে ঝাঁকানি দিল। আরিফের মাথা মেঝেতে ঝুলে পড়ল। প্রাণহীন।
নীলার মনে হলো, তার কানে তালা লেগেছে। কিছুই শুনতে পাচ্ছে না সে। আরিফের কবজিতে আঙুল চেপে নাড়ির স্পন্দন খুঁজতে লাগল। না। কিছুই নেই।
“না, না, না!” গলা ভেঙে যাওয়া স্বরে আরিফের কাঁধে জোরে ঝাঁকানি দিল, “আরিফ, জেগে ওঠো! দোহাই!”
চোখে জলের বন্যা নামল। আরিফের বুকের ওপর কান পেতে রাখল। হৃদস্পন্দন শোনার আশায়। না, কিছুই নেই। এখানেও নীরবতা।
কাঁপতে থাকা হাতে ফোনটা খুঁজতে লাগল নীলা। সাহায্যের আশায়। প্রথমে ডায়াল করল আরিফের নাম্বার। যেন ফোন করলেই সে ফিরে আসবে।
পাশেই কোনো এক জায়গায় একটা ভোঁ ভোঁ শব্দ হচ্ছে।
বিছানার পাশের টেবিলে আরিফের ফোনটা ভাইব্রেট করছে। স্ক্রিনে তার কলের নোটিফিকেশন। আলো জ্বলছে।
নীলা বুঝতে পারে তার বড়ো একটা ভুল হচ্ছে। গভীর শ্বাস নিয়ে চিন্তা কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করল। সাহায্য চাইতে হবে। কাউকে ডাকতে হবে।
আরিফের বড় ভাই আসিফের নাম্বার ডায়াল করতে গিয়ে আঙুল পিছলে যেতে লাগল। একবার, দুবার রিং বেজে উঠল।
কেউ ধরল না। আবার চেষ্টা করল। না। কেউ ধরল না।
নীলার হঠাৎ মনে হলো, সে কি পাগল হয়ে গেছে? বাড়িতে থেকেই কেন মোবাইলে কল দিচ্ছে! বাসার সবাইকে ডাক দিলেই তো হয়।
সে দরজার দিকে ছুটল। হৃদস্পন্দন যেন তার বুক ফেটে দিতে চাচ্ছে।
“আসাদ! মা! বাবা” তার চিৎকারে ঘর যেন কেঁপে উঠল।
কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা। তারপর সিঁড়ি থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ।
সবার আগে এল আসিফ, চোখেমুখে তার বিরক্তির ছাপ। “কী হয়েছে? এভাবে চিৎকার করছ কেন?”
নীলার মুখ দেখেই থমকে গেল।
“আরিফ, আরিফ–” নীলা বাক্য শেষ করতে পারল না। বেডরুমের দিকে আঙুল তুলে দেখাল।
আসিফ তাকে ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকল, পিছু পিছু তার দেবর আসাদ আর তাদের বাবা আমজাদ খান। ননদ লায়লাও ছুটে এল। নীলার শাশুড়ি লতিফা বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল।
সবাই ঘরে ঢুকতেই সেখানকার বাতাস ভারী হয়ে গেল।
আসিফ হাঁটু গেড়ে আরিফের গলায় দুই আঙুল রাখল। তার মুখ কালো হয়ে গেল। কবজিতে নাড়ি খুঁজতে লাগল। পেরিয়ে গেল কয়েক সেকেন্ড। না, কোনো সাড়া নেই।
আসিফ হাত সরিয়ে নিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। অভিব্যক্তি অপরিবর্তিত। মাথা নাড়াল। মুখে বলল, “চলে গেছে।”
নীলার হাঁটু ভেঙে গেল। “না! এটা সম্ভব না! দুপুরেও সে একদম ঠিক ছিল!”
লতিফা বেগম নাটকীয় কান্নায় ফেটে পড়ল, বুক চাপড়াতে লাগল, “আহা, আমার ছেলে! আমার ছেলে! আরিফ!”
নীলা শ্বশুরের দিকে ঘুরল, “হসপাতালে নিতে হবে! হয়তো! হয়তো এখনও বেঁচে আছে সে!”
আমজাদ খান হাত তুলে নীলাকে থামালেন। শান্ত, অতি শান্ত স্বরে, “নীলা, সময় পার হয়ে গেছে।”
নীলার পেটে মোচড় দিল। “কীভাবে মারা গেল, তাও তো জানি না!”
সবাই নীরব। কেউ জবাব দিল না।
আসিফের দিকে, তারপর আসাদের দিকে তাকাল। তাদের মুখে রহস্যময় ঔদাসীন্য। লায়লা হাত গুটিয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি মেঝের দিকে।
নীলার মনে হয়, কিছু একটা গোলমাল আছে। মুখে বলে, “পোস্ট-মর্টেম করাতে হবে।”
লতিফা বেগমের কান্না থেমে গেল। ঘরে যেন কবরের নীরবতা।
“হবে না,” দৃঢ় স্বরে বললেন আমজাদ খান।
নীলা চমকে, “কী?”
“পোস্ট-মর্টেম করা যাবে না,” আমজাদ খান ভারী সুরে বললেন।
নীলার নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার জোগাড়। “কিন্তু!”
“আসিফ, ইমাম সাহেবকে ডাকো,” আমজাদ খান নির্দেশ দিলেন, “রাতেই জানাজার ব্যবস্থা করো।”
নীলার হাতের মুঠি শক্ত হয়ে আসে। মনে মনে ভাবে, ওরা তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে। সত্যি এড়িয়ে যাচ্ছে।
তার হৃৎস্পন্দন আরও দ্রুত হতে থাকে।
আরিফের কী হয়েছিল? কীভাবে সে মারা গেল? কেন? এই বাড়ির কারো না কারো জানা আছে নিশ্চয়।
আর নীলা সেটা জানবেই।
দুই
নীলা বিছানার কিনারায় বসে আরিফের প্রাণহীন দেহের দিকে তাকিয়ে রইল। একসময় তার হাসিতে ভরে থাকা ঘরটি এখন কবরের মতো মনে হচ্ছিল।
তার সারা শরীরে একটা গভীর শীতলতা এসে ভর করল, কিন্তু সেটা শুধু দুঃখের নয়—ভয়ের।
সে শোবার ঘরের চারপাশে তাকাল। বিছানার পাশের ল্যাম্পের আলোয় একটা ম্লান হলুদ আভা ছড়িয়ে পড়েছে। আলোতে ছায়াগুলো দেয়াল জুড়ে ছড়িয়ে আছে। নীলা ছায়াগুলো দেখছে আর তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
কেন আরিফ মারা গেল? দুপুরে সে পুরোপুরি সুস্থ ছিল।
তার দৃষ্টি বিছানার পাশের টেবিলের উপর পড়ল। একটা কাচের গ্লাস একপাশে কাত হয়ে পড়েছিল। কিছুটা পানি পালিশ করা কাঠের উপর তখনও জমা হয়েছিল। নীলার নিঃশ্বাস আটকে গেল। তাকে কি বিষ দেওয়া হয়েছিল?
গ্লাসের দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে নীলার হাত কাঁপছিল। সে এটি শুঁকে দেখল কিন্তু অস্বাভাবিক কিছু পেল না। অবশ্য বিষের সবসময় গন্ধ থাকে না।
সে অন্যদের দিকে ফিরে তাকালো। মনের ভেতরে অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও স্থির কণ্ঠে আসিফকে বলল, “ভাইয়া, আমাদের পুলিশ ডাকতে হবে।”
আসিফের মনে হয় একটু রেগেই গেল। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে ঘরের সবাইকে একবার দেখে নিল।
আসিফের উত্তর দেওয়ার আগেই আমজাদ খান দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “কোন প্রয়োজন নেই।”
নীলার ভেতরটা গুমরে কেঁদে উঠল।
“কোন প্রয়োজন নেই?” নীলা একদম চেঁচিয়ে উঠল। “আরিফ মারা গেছে! আর আপনারা জানতেও চান না কেন, কী কারণে সে মারা গেল?”
আমজাদ খান গম্ভীর স্বরে বললেন, “চেঁচিয়ো না, বউমা। আমাদের পরিবারের একটা সম্মান আছে। আমরা এই ধরনের বিষয়ে আমাদের বাড়িতে পুলিশকে আনতে চাই না।”
নীলার আঙুল মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। “এটা সম্মানের বিষয় নয়। এটা ন্যায়বিচারের বিষয়! একটা মানুষ মারা গেল নাকি কেউ তাকে মেরে ফেলল তাও জানতে পারব না! কিন্তু কেন?”
পুরো ঘরটা কিছুক্ষণের জন্য নীরব হয়ে থাকল।
তারপর, লতিফা বেগম জোরে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “নীলা, মা আমার, এটা ছেড়ে দাও। আল্লাহ তাকে নিয়ে গেছেন। আমাদের এটা মেনে নিতে হবে।”
“এটা মেনে নাও!” নীলার কণ্ঠ রাগে কেঁপে উঠল। “আমি এটা কখনো মেনে নেব না। না! না! না!”
সে তার দেবর আসাদের দিকে ফিরে বলল, “তুমি অন্তত পুলিশকে ফোন করো।”
আসাদ নড়ল না।
ননদ লায়লা অস্বস্তিকরভাবে সরে গেল। আসাদ অন্যদিকে তাকাল।
নীলার রক্ত টগবগ করে উঠল। তাদের উদাসীনতায় সে একদম হতাশ হয়ে পড়ল। তার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।
“আমি নিজেই পুলিশকে ফোন করব,” সে ফোনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
সে ফোন করার আগেই আসিফ তার কব্জি ধরে ফেলল।
“তোমার পাগলামি থামাও,” সে রাগের স্বরে বলল। “তুমি পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলছো।”
নীলা তার হাত সরিয়ে দিল।
“আমি পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলছি, তাই না? আমার স্বামী মারা গেছে, আর সবাই এমন ভান করছে যেন এতে কিছু যায় আসে না!”
লতিফা বেগম তার চোখের জল মুছে সোফায় বসলেন। “আমরা জানাজার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। তোমার নাটকের জন্য আমাদের সময় নেই।”
নীলার হৃদয় কেঁপে উঠল। তারা কিছু লুকাচ্ছিল। আর সেটা কী তা খুঁজে বের করবে।
সেই রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তর্ক-বিতর্কের পর, নীলাকে জোর করে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। জানাজার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। আত্মীয়স্বজনরা আসতে শুরু করেছিল। নীলার দিকের কেউ আসেনি। তাদের অমতে আরিফকে বিয়ে করার কারণে বিয়ের পর থেকেই পরিবারের লোকজনের সাথে নীলার সম্পর্ক বিছিন্ন ছিল।
বাড়িতে নীলা ছাড়া সবাই ব্যস্ত ছিল। সে তার শোবার ঘরে, আরিফের ঢাকা শরীরের পাশে বসেছিল।
গত কয়েকদিনের সবকিছু তার মনে বারবার ঘুরছিল। আরিফ কিছু একটা নিয়ে চাপে ছিল। তার সবকিছুতেই একটা ছন্নছাড়া ভাব ছিল। নীলা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “কী হয়েছে তোমার?” কিন্তু আরিফ কেবল হেসে বলেছিল, “না, তেমন কিছু হয়নি। চিন্তার কিছু নেই।”
কিন্তু নীলা নিশ্চিত যে কিছু একটা সমস্যা হয়েছিল আরিফের। নীলা তার চোখের পানি মুছে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। তাকে যুক্তি দিয়ে এগোতে হবে। যদি অন্য কেউ উত্তর না চায়, তাহলে সে নিজেই সেগুলো খুঁজে বের করবে।
ঘর থেকে আরিফকে নিয়ে যাওয়ার পর নীলা আবার কাচের গ্লাসের কাছে গেল। সে গ্লাসটি তুলে আবার পরীক্ষা করল। তারপর তার চোখ মেঝেতে গিয়ে পড়ল। ঠিক তখনই সে একটা জিনিস দেখতে পেল। বিছানার কাছে নিচে একটা ছোট সাদা প্যাকেট। কার্পেটের নিচে অর্ধেক লুকানো।
সে যখন সেটা হাতে তুলে নিল তখন তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। সেটা কুঁচকে গিয়েছিল। কিন্তু তাতে কিছু লেখা দেখতে পেল। সে প্যাকেটটা খুলল। একটা হালকা সাদা পাউডার কিনারায় লেগে ছিল। বিষ?
তার নিঃশ্বাস আটকে গেল। এটা পরীক্ষা করা দরকার ছিল। সে আরও কিছু ভাবতে পারার আগেই দরজা থেকে মৃদু টোকা পড়ল। সে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল। প্যাকেটটা কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখল।
নীলার দেবর আসাদ ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে। “ভেতরে আসব?”
“এসো।”
“তুমি ঠিক আছো?” সে শান্তভাবে জিজ্ঞাসা করল।
নীলার চোখ সরু হয়ে গেল। “আমি কি ঠিক আছি? এটাই তুমি জানতে চাচ্ছ?”
আসাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমি জানি তুমি বিরক্ত হচ্ছ, কিন্তু তুমি রেখো, তুমি আমার বাবার বিরুদ্ধে কখনই জিততে পারবে না।”
নীলার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। “তাহলে তুমি বলছ যে আমি আরিফের মৃত্যুর কারণ বের করার চেষ্টা করব না।”
আসাদ ইতস্তত করল। “আমি কখনোই তা বলিনি।”
নীলা বুঝতে পারল, আসাদের কণ্ঠে কিছু একটা ছিল, কিছু একটা।
নীলা আরও কাছে এল। “তুমি কি কিছু জানো?”
আসাদ বলল, “আমি নিশ্চিতভাবে কিছুই জানি না। কিন্তু-”
“কিন্তু কি?”
আসাদ তার কণ্ঠস্বর নিচু করে বলল। “আমার মনে হয় ড্রাইভার সোহেল কিছু জানে।”
নীলার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। “সোহেল?”
সে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ, সোহেল। আজ সে অদ্ভুত আচরণ করছিল।”
নীলার হৃৎস্পন্দন দ্রুত হতে লাগল।
সে কখনোই সোহেলকে পছন্দ করত না। তার মধ্যে কিছু একটা অস্থিরতা ছিল। নীলার সামনে সে সব সময় একটা অস্বস্তির ভাব নিয়ে থাকত। আসাদ যদি ঠিক বলে থাকে তাহলে নীলা অবশ্যই তার মুখোমুখি দাঁড়াবে।
নীলা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আগামিকাল সকালেই সে সোহেলের সাথে দেখা করবে। সে সত্যকে খুঁজে বের করবেই। এমনকি এতে যদি তার নিজের প্রাণও চলে যায় তাতেও তার আপত্তি নেই।
(চলবে)