যদি হারিয়ে যাই, দেখা হবে এখানেই
লেখকের কথা
২০২২ থেকে শুরু করে ২০২৫ এর প্রায় শেষ পর্যন্ত, এই দীর্ঘ চার বছরে জাতীয় দৈনিক ও সাহিত্য পত্রিকায় আমার লেখা যেসব গল্প ছাপা হয়েছে তার মধ্য থেকে বাছাই করা বারোটি গল্প এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। গল্পগুলোর বিষয়ে একটা ভূমিকা আমি প্রাসঙ্গিক মনে করি।
স্পর্শ
‘স্পর্শ’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল শ্রদ্ধেয় কবি ওবায়েদ আকাশ সম্পাদিত দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য সামিয়িকী ৬ নভেম্বর ২০২৫ সংখ্যায়।
আধুনিক শহুরে জীবনে আমরা যা করি, তার প্রায় সবই টাকার হিসাবের মধ্যে বাঁধা। সেখান থেকে আমি ইচ্ছে করে হাঁটতে চেয়েছি সম্পূর্ণ উল্টো দিকে – এক ছোট গ্রামীণ মাটির ঘর, এক বুড়ো মানুষ, আর তার হাতে তোলা একটা মিষ্টি।
এই গল্পে মিষ্টিটা আসলে চিনি, দুধ আর ছানার জিনিস নয়; এটা সময়, ঐতিহ্য আর অলাভজনক ভালোবাসার প্রতীক। নরেন ঘোষের নাম থেকে শুরু করে বীরেন ঘোষ, তারপর স্বর্ণা – আমি দেখাতে চেয়েছি, কীভাবে একটা পরিবার একটা ঐতিহ্য ধরে রাখার মাধ্যমে নিজেদের ভেতরের মানুষটাকে বাঁচিয়ে রাখে। প্রতিদিন মাত্র চল্লিশটা মিষ্টি, দিনে একজন একটিই খেতে পারবে, আর তার ভেতরেই অশেষ এক জাদু – এটা আমার কাছে পরিমিতি আর চলমান ঐতিহ্যের ভাষা।
রাজনীতি, ধর্ম, যুদ্ধ – সবকিছু গল্পে এসেছে, কিন্তু মূল চরিত্র আসলে ‘স্পর্শ’ নিজেই। সেই স্পর্শ কখনো মিষ্টির, কখনো সাইনবোর্ড মেরামত করা মুসলিম কাঠমিস্ত্রির, কখনো দাদুর থেকে নাতনির, আর শেষে পাঠকের ভেতর পর্যন্ত চলে যাওয়ার চেষ্টা।
আমি চাই, পাঠক যখন শেষ লাইনটা পড়বে, তখন তারও যেন মনে হয় – কোনো কোনো স্বাদ, কোনো কোনো স্পর্শ সারাজীবনের জন্যই যথেষ্ট, আর সবকিছুই অর্থ দিয়ে মাপা যায় না।
অপেক্ষা
‘অপেক্ষা’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল শ্রদ্ধেয় কবি জুননু রাইন সম্পাদিত দৈনিক যুগান্তর-এর সাহিত্য সামিয়িকী, ২২ এপ্রিল ২০২২ সংখ্যায়।
এই গল্প লেখার সময় আমি মানুষের স্মৃতি, একাকিত্ব এবং বৃদ্ধাবস্থার ভঙ্গুরতার ভেতর ডুবে ছিলাম। আমরা প্রতিদিন যাকে ‘আমি’ বলে জানি, সেটাই কত সহজে ভেঙে যেতে পারে – এই উপলব্ধি আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তাই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রকে আমি বসিয়েছি এক কুয়াশা-ঢাকা লেকের ধারে, যেখানে চারপাশের অস্পষ্ট পৃথিবীর মতো তার নিজের ভেতরের পৃথিবীও পুরোপুরি ঝাপসা হয়ে গেছে।
আমি চেয়েছি পাঠক যেন অনুভব করেন, স্মৃতিভ্রংশ আসলে শুধু ভুলে যাওয়া নয়; এটি ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্ব হারানোর এক নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া। পরিচিত শব্দ, পরিচিত মুখ, পরিচিত পথ, সব একদিন অপরিচিত হয়ে যায়। গল্পের বৃদ্ধ চরিত্রটির আচমকা আতঙ্ক, ছোট ছোট লজ্জা, পরিবারের প্রতি আকুতি, এসবের মধ্যে আছে আমার দেখা বহু মানুষের কাহিনি, যারা এই রোগে আক্রান্ত হয়ে নিজেদের ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছেন।
এই গল্প লিখতে গিয়ে আমি নিজেই বারবার ভাবছিলাম, একজন মানুষ ঠিক কোন মুহূর্তে ‘নিজেকে হারিয়ে ফেলা’ শুরু করে? আর কোন বিন্দুতে সে অনুভব করে, তার ভেতরের ফিরে আসার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে? গল্পটি সেই হারিয়ে যাওয়ার ভেতরে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয়ের আলো খুঁজে ফেরার এক নীরব, মর্মস্পর্শী যাত্রা।
মার্জিন
‘মার্জিন’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল শ্রদ্ধেয় কবি আল মুজাহিদী সম্পাদিত শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির কাগজ ‘নতুন এক মাত্রা’য়, বর্ষ ৯, সংখ্যা ২, মার্চ-এপ্রিল (বসন্ত) ২০২৩।
এই গল্প লিখতে বসার সময় আসলে আমার মাথায় শুধু একটাই শব্দ ঘুরছিল, ‘মার্জিন’, খাতার পাতার সেই সরু দাগ, যেখানে কিছু লেখা হয় না; কিন্তু যেটা না থাকলে পুরো লেখাটাই কেমন অগোছালো, অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। এই ছোট্ট দাগটার সাথেই আমি শহরের ফুটপাত, বিল্ডিংয়ের ফাঁকা জায়গা, এমনকি মানুষের জীবনের সীমা, সবকিছুর সম্পর্ক খুঁজতে চেয়েছি।
আজগর আলী মাস্টার আসলে আমার কাছে একটা প্রজন্মের প্রতীক – যাদের শাসন, কড়া নিয়ম, ‘মার্জিন টানতেই হবে’ টাইপ কথা আমাদের ছোটবেলায় খুব বিরক্তিকর মনে হলেও, সেই একই শাসন আমাদের ভেতরে কোথাও এক ধরনের শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ আর সীমা-জ্ঞান তৈরি করেছে। অন্যদিকে শাহীন, এই সময়ের খুব পরিচিত এক চরিত্র, যে হিসেব করে, জায়গা ফাঁকা রাখে না, সবটুকু জায়গা কাজে লাগায়, লাভ সর্বোচ্চ করে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ‘মুনাফাই’ তাকে আইনের গুঁতোয় বারান্দাহীন করে দেয়।
শেষ দৃশ্যে আজগর আলী মাস্টারের ফিরে গিয়ে আবারও মার্জিনের বেত উঁচু করে ধরাটা আমি ইচ্ছা করেই একটু দ্ব্যর্থক রেখেছি। এটা শুধু পুরনো এক গোঁড়া মাস্টারের শাসন না; বরং তার আতঙ্ক, তার উপলব্ধি, তার শেষ চিৎকারও বটে, ‘সীমা না মানলে একদিন কেউ না কেউ এসে জোর করে ভেঙে দেবে।’
এই গল্প তাই মার খাওয়া ছাত্র আর মারধর করা মাস্টারের সমীকরণ না; বরং কীভাবে একটা ছোট্ট মার্জিন না-মানা ধীরে ধীরে আমাদের চৌহদ্দি, বারান্দা, গাছ, এমনকি বেঁচে থাকার নিরাপদ স্থানগুলো পর্যন্ত সংকুচিত করে ফেলে, তারই এক ছোট্ট, খুব চেনা সময়ে আঁকা ছবি।
সারা রাত ভেজা একটা খরা জালের গল্প
‘সারা রাত ভেজা একটা খরা জালের গল্প’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল শ্রদ্ধেয় কবি ওবায়েদ আকাশ সম্পাদিত দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য সামিয়িকী ১৬ আগস্ট ২০২৩ সংখ্যায়।
এই গল্প লিখতে বসার সময় আমার মাথায় সবচেয়ে আগে এসেছে একটা ছবি—ভেজা, কাঁপতে থাকা একটা খরা জাল, আর তার ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষ, যার ভেতরে একই সঙ্গে জ্বর, ক্ষুধা আর আশার ঘূর্ণিঝড়। মন্তাজকে আমি শুধু একজন জেলে হিসেবে ভাবিনি; ও আমার কাছে সেই অসংখ্য মানুষের প্রতিনিধি, যারা সারারাত ভিজে থাকে, কিন্তু ভোর হলে শুকায় শুধু গা আর কাপড়; ভাগ্যটা আর শুকায় না।
মেয়ের জেদ করা শোল মাছের বাচ্চাটা, ঘরে একমুঠো চাল না থাকা, বৃষ্টির রাত, বিদ্যুতের শব্দ, খাল ভরা নতুন পানি – সবকিছু মিলিয়ে আমি আসলে একটি রাতের মধ্যে পুরো একটা শ্রেণির সংগ্রাম, ক্ষুধা আর অপমান গুঁজে দিতে চেয়েছি। খরা জাল এখানে শুধু মাছ ধরার অস্ত্র না; এটা ভাঙা স্বপ্ন, বেহাল জীবন আর বারবার নতুন করে শুরু করার বাধ্যতামূলক প্রস্তুতির প্রতীক।
চেয়ারম্যানের এক ঝটকায় পুরো রাতের ভেজা পরিশ্রম কেড়ে নেওয়া, ভোটের সময়ের পাঁচশ টাকার হিসাব, আর মেয়ের শোল মাছের স্বপ্ন – এসবের ভেতর দিয়ে আমি দেখাতে চেয়েছি কীভাবে ক্ষমতা খুব সহজেই একজন দরিদ্র মানুষের আশা গিলে ফেলে, আর তারপরও তাকে ফিরিয়ে দেয় শুধু একটা বাক্য: ‘তোর হাতে তো টাইম আছে, তুই আবার জাল লিয়া বস।’
এই গল্প আসলে সেই ‘টাইমওয়ালা’ মানুষের, যার কাছে সময় আছে, কিন্তু নিরাপত্তা নেই; আছে কেবল সারা রাত ভিজে থাকা একটা খরা জাল আর পরের দিনের জন্য বাধ্যতামূলক বেঁচে থাকা।
আজ, এখন, এখানে
‘বৃষ্টি অথবা ঘ্রাণের গল্প’ শিরোনামে ‘আজ, এখন, এখানে’ গল্প প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল শ্রদ্ধেয় লেখক সুব্রত বড়ুয়া সম্পাদিত সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা ‘কালি ও কলম’-এর ‘ছোটগল্প’ সংখ্যায়, বর্ষ ২০, সংখ্যা ২ ও ৩, এপ্রিল ২০২৩।
এই গল্প লিখতে বসার সময় আমি চেয়েছিলাম বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হোক – অন্তত আমার কল্পনায়। কারণ এই গল্পের জন্মই হয়েছে বৃষ্টির ভেতরে আটকে থাকা এক মানুষের ভেতরের ঘূর্ণি থেকে। পাবলিক বাসে বসে থাকা একজন মানুষ -অফিসে দেরি হয়ে যাবার ভয়, চাকরি হারানোর আতঙ্ক, শহরের জলাবদ্ধতা, দায়িত্বের বোঝা, আর তার মাঝখানে হঠাৎ এসে পড়া একটা গন্ধ – আমি এই মানুষটিকে একটা ছবির মতো দেখেছিলাম।
‘আজ, এখন, এখানে’ – এই তিনটা শব্দ আমার কাছে শুধু সময়ের বিভাজন নয়; মানুষের ভেতরে ঘটে যাওয়া খুব সূক্ষ্ম, খুব নীরব, খুব ব্যক্তিগত আবেগের তিনটি স্তর। অফিসে পৌঁছোনোর তাড়নার পাশে যে আকাঙ্ক্ষা, বাসনার গা ঘেঁষে থাকা অপরাধবোধ, আর শহরের বৃষ্টিজনিত বিশৃঙ্খলার ভেতর নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই – এই সবকিছু একসাথে মিশে তৈরি হয়েছে গল্পটা।
আমি চেয়েছি পাঠক যেন বাসের জানালায় বৃষ্টির শব্দ শুনতে পান, সিটকভারের বাজে গন্ধ টের পান, মেয়েটার চুলের গন্ধ নাকে টান মারুক, আর তার পাশের ফাঁকা সিটটা এমনভাবে ডাকুক যেন তারা নিজেরাও নড়েচড়ে উঠতে বাধ্য হন।
এটা কোনো প্রেমের গল্প নয়, কিন্তু আকর্ষণের; কোনো নৈতিক উপদেশ নয়, কিন্তু নৈতিক অস্বস্তির; কোনো সামাজিক প্রতিবাদ নয়, কিন্তু নিঃশব্দ অন্তর্দহন।
মানুষ অনেক সময় ভাবে সে বাইরে কোথাও আটকে আছে, অথচ আসলে সে আটকে থাকে নিজের ভেতরেই। বৃষ্টি থেমে গেলে সবকিছু পরিষ্কার হয়, শুধু ভেতরের জটটাই খোলে না।
এই গল্প আমি লিখেছি সেই আটকে থাকা অনুভূতির খুব কাছাকাছি গিয়ে – আজ, এখন, এখানে।
মাটির কলসে বন্দী পরান পাখি
‘মাটির কলসে বন্দী পরান পাখি’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল শ্রদ্ধেয় কবি জুননু রাইন সম্পাদিত দৈনিক যুগান্তর-এর সাহিত্য সামিয়িকী, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ সংখ্যায়।
এই গল্প লিখতে গিয়ে আমি আসলে তিনটা জিনিসকে একসাথে ধরতে চেয়েছি – গ্রামবাংলার ভয়, রাজনীতি আর মানুষের অসহায় বিশ্বাস। ‘মাটির কলসে বন্দী পরান পাখি’–তে আমি এমন একটা বাস্তবতা খুঁজেছি, যেখানে মৃত্যু শুধু মৃত্যু নয়, বরং গুজব, জাদুটোনা, অভিশাপ আর ক্ষমতার হিসাবের ভেতর বেঁচে থাকে।
কাজীপাড়া, কাজী বংশ, নজু পরামানিক, মনা ফকির – এরা কারও একা একার গল্প না; এরা মিলেই এক ধরনের ক্ষমতার গল্প বলে, যেখানে চেয়ারম্যানের গদি আর মানুষের প্রাণ এক অদ্ভুত অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। একটা শিং মাছ, একটা তাবিজ, একটা মাটির কলস – এসব আসলে প্রতীক। এখানে কলসে বন্দী শুধু শিং মাছ না, মানুষের ভয় আর বিশ্বাসও।
আমি চেয়েছি, পাঠক যেন ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন – গ্রামের সরল মানুষ যখন ব্যর্থ হয় যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে, তখন তারা কাকে দায়ী করে? অভিশাপকে, জাদুটোনাকে, শয়তানকে? নাকি অন্তরে জানা সত্ত্বেও কিছু নাম উচ্চারণ না করে চুপ থাকে?
মনা ফকির চরিত্রটা লিখতে গিয়ে আমার নিজের মধ্যেও একটা শীতল স্রোত বয়ে গেছে – যে মানুষটা জিন তাড়াতে জানত, শেষ পর্যন্ত সে-ই তার বই পুড়াতে বাধ্য হয়, কিন্তু শিখে নেওয়া শক্তি, আর নিজের দুঃখ – সেগুলো কি সত্যিই কখনও পুড়ে শেষ হয়? এই প্রশ্নের উত্তরটাই গল্পের ভেতর রেখে দিয়েছি।
উদ্ধার কাজ সমাপ্ত
‘উদ্ধার কাজ সমাপ্ত’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল শ্রদ্ধেয় কবি ওবায়েদ আকাশ সম্পাদিত অধুনাবাদী চিন্তার লিটল ম্যাগাজিন ‘শালুক’-এ, বর্ষ ২৬, সংখ্যা ২৭, ফেব্রুয়ারি ২০২৫।
এই গল্প লেখার পেছনে আমার যে তীব্র মানসিক ধাক্কা কাজ করেছে, তা হলো ২০১২ সালের বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার ধসের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। সংবাদ প্রতিবেদনটি যখন প্রথম পড়ি, তখনই মনে হয়েছিল, এই কয়েক সেকেন্ডের ভেতর যাদের জীবন থেমে গেছে, তাদের শেষ মুহূর্তগুলোর মধ্যে নিশ্চয়ই ছিল গভীর ভয়, অসহায়ত্ব এবং স্মৃতি-ছিন্নভিন্নের মতো এক তীব্র ঝাঁকুনি। সেই মানবিক অনুভূতিটাই ধরতে চেয়েছি এই গল্পে।
আমি ইচ্ছে করে গল্পটিকে সরাসরি দুর্ঘটনার বিবরণ হিসেবে লিখিনি; বরং একজন সাধারণ মানুষের মাথার ভেতরে দুর্ঘটনার মুহূর্তে যে মানসিক ঘূর্ণি তৈরি হয়, সেটির উপর আলোকপাত করেছি। কাজল চরিত্রটিকে আমি এমন জায়গায় দাঁড় করিয়েছি যেখানে স্মৃতি, স্বপ্ন, বাস্তবতা এবং মৃত্যুভয় একসাথে ধাক্কা খায়। মাথার ঝিমঝিম ভাব, ভেতরের দৌড়, শৈশবের দীঘি, পরীর কোমল স্পর্শ, সব মিলিয়ে তার শেষ মুহূর্তগুলো হয়ে ওঠে এক অস্থির, কিন্তু জীবন্ত মনস্তাত্ত্বিক ঝড়।
গল্প লেখার সময় বারবার মনে হচ্ছিল, মানুষ সত্যিই কি মৃত্যুর আগে নিজের জীবনটাকে সম্পূর্ণভাবে ফিরে দেখতে পায়? নাকি ভাঙা টুকরো, অসঙ্গত স্মৃতি, আর অসমাপ্ত ভালোবাসার ডাকই বেশি তাড়া করে? ‘উদ্ধার কাজ সমাপ্ত’ তাই শুধু একটি দুর্ঘটনার গল্প নয়; এটি মানুষের ভেতরের উদ্ধার না-হওয়া অংশগুলোর গল্প, যা কখনোই সম্পূর্ণভাবে ভূ-পৃষ্ঠে ফিরে আসে না।
ইলেকশান
‘ইলেকশান’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল শ্রদ্ধেয় কবি আল মুজাহিদী সম্পাদিত শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির কাগজ ‘নতুন এক মাত্রা’য়, বর্ষ ৮, সংখ্যা ৪, জুলাই-আগস্ট (বর্ষা) ২০২২।
এই গল্প লেখার সময় আমার মাথায় ছিল একটি খুব ছোট, কিন্তু খুব দৃশ্যমান ছবি – একটা বস্তিতে আগুন লেগেছে, মানুষ দৌড়াচ্ছে, আর রাস্তার পাশে এক টিনের হোটেলে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, যার মন ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু তার নীতি ভাঙছে না।
‘ইলেকশান’ এমন একটি গল্প, যেখানে রাজনীতি কোনো দূরের বিষয় নয় – রাজনীতি চরিত্রদের জীবনে আগুন হয়ে নামে, অথবা খিচুড়ির পাতিলে বাঁচার উপায় হয়ে ওঠে। আমি দেখাতে চেয়েছি – এই দেশের হাজারো নির্বাচনের ভেতরে সবচেয়ে নির্মম সত্য কী? সেটা হলো, ক্ষমতার লড়াই চলাকালীন সবচেয়ে অরক্ষিত মানুষগুলোই প্রথম শিকার হয়।
হাসান আলী চরিত্রটিকে আমি ইচ্ছা করেই দ্বিমুখী করেছি – সে প্রচণ্ড নির্মম, আবার অত্যন্ত হিসেবি। সে জানে, বস্তির দুই-আড়াই হাজার ভোট তাকে বানাতে পারে বা নামাতেও পারে। সেই ভোটের জন্যই আগুন লাগানো যায়, পরিকল্পনা করা যায়, নৈতিকতা বেচে দেওয়া যায়। কিন্তু যে পৃথিবীতে সে রাজনীতি করে, সেখানে কোনো সীমার রেখাই স্থায়ী নয় – কারণ সেই রেখা মুছে দিতে পারে সাধারণ মানুষও।
এই গল্পের প্রকৃত নায়ক চেরু মিয়া। একজন সোজাসাপ্টা, নীতি আঁকড়ে থাকা সাধারণ মানুষ, যার একপাতিল খিচুড়ি রান্নার নিয়মটাই একধরনের প্রতিরোধ। তার প্রতিরোধের অস্ত্র হলো – ‘না’ বলা।
তার এক চড়, তার দাঁত চেপে হাঁটা, তার দলের ভারি হয়ে ওঠা – এটাই প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের নৈতিকতা শেষ পর্যন্ত ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেও বিপরীত বাতাস বইয়ে দিতে পারে।
আমি দেখাতে চেয়েছি, আগুনের সামনে দাঁড়ানো মানুষ আর আগুন লাগানোর মানুষ, দুজনকেই এই সমাজ একসাথে তৈরি করে। কিন্তু গল্পের শেষে বেছে নিতে হয়, আমরা কার দিকে দাঁড়াব।
এ গল্পে আমি কোনো বিচার দিইনি, কোনো নৈতিক শিক্ষা দিইনি। শুধু দেখাতে চেয়েছি, ক্ষমতার অগ্নিপরীক্ষায় সাধারণ মানুষের হাতের খিচুড়ির পাতিলও কখনো কখনো ভোটকেন্দ্রের ব্যালটবক্সের মতো শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
‘ইলেকশান’ আমার জন্য সেই মুহূর্তের গল্প, যখন একজন সাধারণ মানুষ বুঝে ফেলে, তার নীতিই তার অস্ত্র। আর সেই অস্ত্র কখনো কখনো টাকার ব্যাগে ভরা ক্ষমতাবানদের ঘাম ছুটিয়ে দিতে পারে।
সিরিয়াল কিলার
‘সিরিয়াল কিলার’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল শ্রদ্ধেয় কথা সাহিত্যিক মোহিত কামাল সম্পাদিত সাহিত্য সংস্কৃতির মাসিক পত্রিকা ‘শব্দঘর’-এ, বর্ষ ১৩, সংখ্যা ২, ঈদ সংখ্যা, ২০২৬।
আমি এই গল্পের ভেতরে যে মানুষটাকে দাঁড় করিয়েছি, সে রফিক, একজন লাশবাহী গাড়ির ড্রাইভার। কেউ মারা গেলে, তার গল্প শেষ হয়; কিন্তু রফিকের গল্প তখনই শুরু হয়। এই অসহায়, অদ্ভুত জায়গাটার দিকে আমি তাকাতে চেয়েছি – যেখানে মৃত্যু একটা পেশা হয়ে যায়, আর মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়ে ওঠে অন্য মানুষের শেষ যাত্রা।
রফিক নিজেকে খুনি ভাবে, কারণ সে বিশ্বাস করতে শিখে গেছে, যেদিকে সে তাকায়, সেদিকেই মৃত্যু এসে দাঁড়ায়। এই বিশ্বাসটা বাস্তবের চেয়ে বেশি মনোজগতের। আমি আসলে খুঁজেছি সেই জায়গা, যেখানে মানুষ অপরাধী না হয়েও নিজেকে অপরাধী ভাবে, যেখানে ‘খুনি’ শব্দটা আদালতের চার দেয়ালের মধ্যে না, বরং নিজের বুকের ভেতর উচ্চারিত হয়।
এই গল্পে আমি ইচ্ছে করেই কোনো নাটকীয় মৃত্যু, রহস্য, তদন্ত, রক্তাক্ত দৃশ্য আনিনি। বরং দেখাতে চেয়েছি, কীভাবে খুবই সাধারণ, প্রতিদিনের, চেনা এক শহরের ভেতরে একজন সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে নিজের চোখকে ভয় পেতে শুরু করে -নিজের মেয়ে, মা, স্ত্রীর মুখের দিকেও তাকাতে তার হৃদয় কাঁপে।
আমার কাছে এই গল্প একধরনের নীরব স্বীকারোক্তি – যাদের কাজ আমাদের চোখে ‘সেবা’ কিংবা ‘ডিউটি’, তাদের ভেতরের অদৃশ্য ক্ষতগুলো আমরা দেখি না। মৃত্যু এখানে শুধু শেষ নিঃশ্বাসের নাম নয়, বরং এক ধরনের গন্ধ, এক ধরনের শব্দ, এক ধরনের ক্লান্তি, যা ধীরে ধীরে একজন মানুষকে ভিতর থেকে ফাঁপা করে দেয়।
একজন হেলেন অব স্পার্টার দিনলিপি
‘একজন হেলেন অব স্পার্টার দিনলিপি’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল শ্রদ্ধেয় কবি সাখাওয়াত টিপু সম্পাদিত বাংলায় পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য পত্রিকা ‘প্রতিধ্বনি’-তে, ৮ নভেম্বর ২০২৫।
এই দিনলিপি লিখতে গিয়ে আমি আসলে এক জন মধ্যবয়সী, বিবাহিত নারীর ইচ্ছা,দুঃসাহস আর নিজেকে আটকে রাখার কৌশল – এই তিনটার ভিতরের টানাপোড়েন লিখতে চেয়েছি। ‘হেলেন অব ট্রয়’ নয়, ‘হেলেন অব স্পার্টা’, এই নাম বেছে নেওয়ার ভেতরেই আমার ইচ্ছে ছিল তাকে একদিকে পৌরাণিক আগুনের আলোয়, আরেকদিকে রান্নাঘরের টাইলসে দাঁড় করানো।
আমি চেয়েছি, পাঠক যেন বুঝতে পারেন – একজন নারী একই সঙ্গে ভালোবাসা, দায়িত্ব, সংসার, শরীরের তৃষ্ণা আর সামাজিক ভদ্রতার মধ্যে কীভাবে প্রতিদিন সামঞ্জস্য খোঁজেন। তার জীবনে দুই পুরুষ থাকলেও আসলে পুরো গল্পটাই তার নিজের ভেতরের যুদ্ধ: আমি কে? আমার আগুন কোথায় রাখব? কতটা জ্বালাব, কতটা কমাব?
ফুটতে থাকা দুধ, কমিয়ে দেওয়া আঁচ, রাত জাগা ফোনের স্ক্রিন, স্বামীর পাশে নিরাপদ আলো, আর দূরের এক ‘পাগল’ মানুষের অসমাপ্ত ডাক, এসবের মধ্যে দিয়ে আমি দেখাতে চেয়েছি, প্রেম মানে শুধু পালিয়ে যাওয়া নয়; প্রেম মানে অনেক সময় ‘না-পালিয়ে থেকে’ বেঁচে থাকার সিদ্ধান্তও।
দিনলিপির এই হেলেন বাহিরে খুবই সাধারণ গৃহিণী, আর ভেতরে নিজের ব্যক্তিগত ট্রয়ের রাণী, আমি তার এই দ্বৈত সত্তার কণ্ঠস্বরকে যতটা সম্ভব সত্য, জটিল আর নিষ্পাপ রাখতে চেয়েছি।
অতিথি
‘অতিথি’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল শ্রদ্ধেয় কবি জুননু রাইন সম্পাদিত দৈনিক যুগান্তর-এর সাহিত্য সামিয়িকী, ২৪ মে ২০২৪ সংখ্যায়।
‘অতিথি’গল্প লিখতে গিয়ে আমি মূলত কয়েকটি অনুভূতিকে একসাথে ধরতে চেয়েছি – প্রলোভন, ভয় এবং অচেনা রাতের অদৃশ্য শক্তি। রাঙামাটির পাহাড়ি রাস্তা এবং কুয়াশা ঢাকা লেক আমার কাছে সবসময়ই এক ধরনের মায়াবী বিপদ, যেখানে আকর্ষণ আর আতঙ্ক একই সঙ্গে কাজ করে। সেই জায়গাটিকে আমি ব্যবহার করেছি এক মানুষের দুর্বলতার মুখোমুখি হওয়ার পটভূমি হিসেবে।
সুজনের চরিত্র আসলে আমাদের আশেপাশের বহু মানুষের প্রতিনিধিত্ব, যে মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণে খুব দক্ষ মনে করে, কিন্তু একটুখানি সৌন্দর্য, অতিরিক্ত মনোযোগ বা প্রশংসা তাকে সহজেই দিকভ্রান্ত করতে পারে। তার স্ত্রী-সন্দেহ, তার নিজের অহং, আর অতিথির নিষ্পাপ কোমলতায় লুকিয়ে থাকা বিপদের ইঙ্গিত, সবকিছু মিশে আমি এমন একটা গল্প বানাতে চেয়েছি, যেখানে পাঠক প্রথমে শুধু রোমাঞ্চ দেখবে, পরে টের পাবে অস্বস্তি, আর শেষে দাঁড়াবে এক অচেনা সাদা জগতের সামনে।
এই গল্পের ‘অতিথি’ মানুষ নয়; বরং আকর্ষণ, প্রলোভন, অপরিচিত সৌন্দর্য, আর একটি অদৃশ্য অতল গহ্বর। পাহাড়ি রাতে সাদা শাড়ির ঝলক, বোট ট্রিপের আমন্ত্রণ, কুয়াশায় মোড়া ডাকবাংলো – এসবই এখানে প্রতীক।
শেষে সুজনের নিজের পোশাক সাদা হয়ে যাওয়া, তার দমবন্ধ অনুভব, আর অপর প্রান্তে প্রশান্তি – এই মুহূর্তগুলো আমি চাই পাঠকের মনে প্রশ্ন তোলে: আসলে কে কাকে অতিথি হিসেবে বেছে নিল? মানুষ অতিথির কাছে গেল, নাকি মৃত্যু মানুষের কাছে এল?
এই প্রশ্নের উত্তর পাঠক যেন নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করতে পারে, এইটুকুই আমার চাওয়া।
যদি হারিয়ে যাই, দেখা হবে এখানেই
‘যদি হারিয়ে যাই, দেখা হবে এখানেই’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল শ্রদ্ধেয় কবি ওবায়েদ আকাশ সম্পাদিত অধুনাবাদী চিন্তার লিটল ম্যাগাজিন ‘শালুক’-এ, বর্ষ ২৭, সংখ্যা ২৮, নভেম্বর ২০২৫। পরবর্তীতে শ্রদ্ধেয় সম্পাদক তানিম কবির-এর সম্পাদনায় প্রথম আলো’র ‘অন্য আলো’ অনলাইন সাহিত্য মাগাজিনে পুনরায় প্রকাশিত হয়।
এই গল্প লিখতে গিয়ে আমি আসলে এক ধরণের “অপেক্ষার মানচিত্র” আঁকতে চেয়েছি, যেখানে সময়, শহর আর মানুষের সম্পর্ক ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যায়, কিন্তু একটি পুরনো প্রতিশ্রুতি অদৃশ্য সুতো হয়ে থেকে যায়। ‘যদি হারিয়ে যাই, দেখা হবে এখানেই’, এটা আমার কাছে শুধু একটা গল্প নয়, বরং এমন সব মূল্যবান সম্পর্কের প্রতীক, যেগুলোকে আমরা সময়ের ব্যস্ততায় হারিয়ে ফেলি, কিন্তু মন ঠিকই কোনো এক জায়গায়, কোনো এক ছাউনির নিচে, কাউকে রেখে দিই অপেক্ষায়।
এই গল্পের বৃদ্ধকে আমি দাঁড় করিয়েছি এমন এক শহুরে প্রান্তে, যেখানে আর কোনো বাস থামে না, কোনো রুটের মানচিত্রে যার নাম নেই, কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবনের মানচিত্রে এই জায়গাটা গভীরভাবে চিহ্নিত। এখানে তার বন্ধুত্ব, যৌবন, প্রতিশ্রুতি আর পরিণত বয়সের একাকিত্ব, সব একসাথে বসে আছে।
আমি চেয়েছি, পাঠক যেন অনুভব করেন, কীভাবে আধুনিক নগরজীবন, প্রযুক্তি, দূরে সরে যাওয়া সন্তান আর ব্যস্ত প্রজন্ম একজন মানুষকে ধীরে ধীরে ঠেলে দেয় এক পুরোনো, অচল বাসস্টপের মতো অবস্থায়; মানচিত্রে অপ্রয়োজনীয়, কিন্তু ভেতরের স্মৃতিতে ভয়ংকর জীবন্ত। গল্পটা তাই শেষ পর্যন্ত একজন মানুষের হারিয়ে যাওয়ার চেয়ে বেশি, তার শেষ ভরসাটুকু নীরবে মুছে যাওয়ার গল্প।
এই বারোটি গল্পের দিকে আমি যখন ফিরে তাকাই, মনে হয় আমি যেন আমার নিজের জীবনের বারোটি আলাদা জানালা খুলে রেখেছি। প্রতিটি গল্পে আমি চেষ্টা করেছি মানুষের খুব কাছাকাছি দাঁড়াতে—তাদের ভয়, নীতি, লোভ, ভুল, একাকিত্ব, স্মৃতি, আকর্ষণ, মৃত্যু ও বেঁচে থাকার ছোট ছোট চেষ্টা ধরতে। গ্রামের ধুলো, বস্তির আগুন, শহরের বৃষ্টি, বুড়োর ভুলে যাওয়া স্মৃতি, জেলের খরা জাল, লাশবাহী ভ্যান – সবই এসেছে আমার ভেতরের সেই জায়গা থেকে, যেখানে মানুষের গল্প আমাকে ক্রমাগত কাঁপিয়ে দেয়।
আমি চাইনি কোনো নীতি শেখাতে; আমি শুধু দেখাতে চেয়েছি আমরা আসলে কতটা নাজুক, আবার কতটা দৃঢ়। কারও স্পর্শে জীবন বদলে যায়, কারও একটানা অপেক্ষায় সময় থেমে যায়, কারও ‘না’ বলায় রাজনীতির বাতাস ঘুরে যায়, আর কারও চোখে মৃত্যু বাসা বাঁধে।
এই বারোটি গল্প তাই আমার কাছে শুধু সাহিত্য নয়; এগুলো আমার মানুষের ভেতর তাকানোর চেষ্টা, আমার নিজের ভাষায় ধরে রাখা জীবনের ক্ষুদ্র কিন্তু তীব্র সত্য।
আবদুল ওয়াহাব
ঢাকা ডিসেম্বর ২০২৫
প্রথম প্রকাশ
বইমেলা ২০২৬
প্রকাশক- পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি
![]()